সব আমদানি পণ্য অফডক থেকে খালাসের প্রস্তাব বন্দরের; বিরোধিতা ব্যবসায়ীদের

0
806

বিশেষ প্রতিনিধি
চট্টগ্রাম বন্দরের ভিতরে থাকা সব ধরনের আমদানি পণ্য বেসরকারী কন্টেইনার ডিপোতে নিয়ে খালাসের প্রস্তাব দিয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। করোনাভাইরাস মহামারির সময় ব্যাপক জাহাজজট-কন্টেইনার জট থেকে রক্ষায় সাময়িকভাবে সব কন্টেইনার অফডকে সরিয়ে নেয়ায় সুফল পেয়েছিল বন্দর। সেই ধারাবাহিকতায় এখন এই প্রস্তাব দিল বন্দর কর্তৃপক্ষ। তবে বন্দর ব্যবহারকারীরা এর চরম বিরোধিতা করে বলছেন, এমনিতেই কন্টেইনার ডিপোগুলোর এত কন্টেইনার খালাস বা রাখার সক্ষমতা নেই। সব আমদানি কন্টেইনার সেখান পাঠানো হলে কন্টেইনার ডিপো মালিকরা জুলুম শুরু করবে। মহামারির সময় ব্যবসা-বাণিজ্যের অবস্থা শোচনীয়। এ অবস্থায় অফডকে মালামাল খালাসের সিদ্ধান্ত নেয়া হলে তা হবে আত্মঘাতী। এতে ব্যবসার ব্যয় বাড়বে।

গত ১ ডিসেম্বর জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে পাঠানো বন্দরের প্রস্তাবে বলা হয়েছে, বিশ্বের অন্য উন্নত বন্দরে সব এফসিএল কনটেইনারের পণ্য আমদানিকারকের চত্বরে বা অফডকে খালাস করা হয়। কিন্তু চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে আমদানি করা কনটেইনারের ২০-২২ শতাংশ অফডকে খালাস হয়, বাকি ৭০-৭৫ শতাংশ বন্দরের ভেতরে খুলে খালাস করা হয়। ফলে প্রতিদিন বন্দরের অভ্যন্তরে কয়েক হাজার ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান প্রবেশ করে। যা কনটেইনার জট, বন্দরের উৎপাদনশীলতা হ্রাস, রফতানি কার্যক্রমে ধীরগতিসহ সার্বিক নিরাপত্তাও বিঘ্নিত করে। এনবিআর থেকে ৩৭টি আইটেমের পণ্য অফডকে খালাসের অনুমতি রয়েছে। পর্যায়ক্রমে আইটেমের সংখ্যা বৃদ্ধি করে সম্পূর্ণরূপে ডেলিভারি কার্যক্রম আমদানিকারকের চত্বর বা অফডকে স্থানান্তর করা গেলে সমস্যার সমাধান হবে।

চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, দেশব্যাপী করোনাভাইরাসের সংক্রমণ প্রতিরোধে সরকার ঘোষিত সাধারণ ছুটির সময় ডেলিভারির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দফতর ও সংস্থার কার্যকারিতা হ্রাস পাওয়ায় বন্দরে কনটেইনার জটের সৃষ্টি হয়। যা বন্দরের উৎপাদনশীলতায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে নৌ মন্ত্রণালয়ের অনুরোধে এনবিআর ৩০ জুন পর্যন্ত বন্দরের সব ধরনের পণ্য অফডকে সংরক্ষণ, স্থানান্তর ও খালাসের অনুমতি দেয়। এ সময় অফডকগুলো সুষ্ঠুভাবে কনটেইনার ডেলিভারি দিয়েছে।

এতে বন্দরের গতিশীলতা ফিরে এসে অপারেশনাল পরিচালনা সহজসাধ্য হয় এবং উৎপাদনশীলতা বজায় রাখা সম্ভব হয়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে বন্দরের স্বাভাবিক অপারেশনাল কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে এবং বর্তমান করোনা পরিস্থিতিতে নির্দিষ্ট একটি স্থানে জনসমাগম কমাতে সব আইটেমের পণ্য অফডকের মাধ্যমে খালাস যুক্তিযুক্ত বলে মনে করে বন্দর কর্তৃপক্ষ। এ বিষয়ে এফবিসিসিআই’র সহসভাপতি সিদ্দিকুর রহমান বলছেন, বন্দরের উচিত তৃতীয় পক্ষের সহায়তা না নিয়ে নিজেদের সক্ষমতা বাড়ানো। আর সব পণ্য অফডকে খালাসের সুপারিশ মোটেও যুক্তিযুক্ত নয়। অফডকে চার্জ বেশি। পণ্য খালাসেও নানারকম বিলম্ব আছে। এ অবস্থায় কোনোভাবেই অফডকে মালামাল খালাসের সিদ্ধান্ত ব্যবসায়ীদের চাপিয়ে দেয়া যাবে না। বন্দরের গতিশীলতা আনতে গ্রিন চ্যানেল চালু করতে পারে। অতীতের ব্যবসার সুনামের ভিত্তিতে দেশের স্বনামধন্য ব্যবসায়ীদের কাঁচামাল এই চ্যানেল দিয়ে করা যায়। তাছাড়া সব গেটে স্ক্যানার বসানো যায়। তাহলে সব পণ্য কায়িক পরীক্ষা করারও প্রয়োজন পড়বে না। তখন সময় সাশ্রয় হবে। বন্দরে জটও হবে না।

সাধারণ ব্যবসায়ী ও আমদানিকারকরা বলছেন, বন্দরের চেয়ে অফডকে পণ্য খালাস করতে প্রায় দ্বিগুণ খরচ হয়। চট্টগ্রাম বন্দরে একটি ২০ ফুট কনটেইনারের আমদানি পণ্য খালাসে সর্বমোট খরচ (লিফট অন/অফ চার্জ, রিভার ডিউজ, লেবার চার্জ এবং এপ্রেইজিং লেবার চার্জ) হয় ৪ হাজার ৬১ টাকা। সেখানে অফডকে পণ্য খালাসে প্যাকেজ ডেলিভারি চার্জ ৭ হাজার ৯৩০ টাকা। এর সঙ্গে যুক্ত হয় লিফট অন/অফ চার্জ ১ হাজার টাকা, রিভার ডিউজ ৪০৮ টাকা এবং এক্সট্রা মুভমেন্ট চার্জ প্রায় ৫২ ডলারসহ সর্বমোট ১৩ হাজার ৭৫৫ টাকা। অন্যদিকে ৪০ ফুট কনটেইনারের ক্ষেত্রে বন্দরে সর্বমোট খরচ হয় ৫ হাজার ৬৯৯ টাকা। আর অফডকে সর্বমোট খরচ হয় ১৮ হাজার ৯২ টাকা। অর্থাৎ বন্দরের চার্জের দ্বিগুণের বেশি টাকা খরচ করে আইসিডিগুলো থেকে আমদানিকারকদের পণ্য খালাস করতে হচ্ছে।

বর্তমানে ১৯টি অফডকের মধ্যে ১৮টি সচল আছে। এসব অফডকে ৩৯টি আইটেমের পণ্য খালাস হয়। এর মধ্যে কাঁচা তুলা, ওয়েস্ট পেপার, ছোলা, সাদা মটর, খেজুর, পশুখাদ্য, পশুখাদ্যের কাঁচামাল, সোডা অ্যাশ, পেঁয়াজ ইত্যাদি বেশি খালাস হয়। চট্টগ্রাম বন্দরের মতো অফডকেও পণ্য খালাসের জন্য ৪ দিন ফ্রি টাইম দেয়া হয়। এরপর প্রথম সপ্তাহের জন্য ২০ ফুট কনটেইনারপ্রতি ৭ দশমিক ৩ ডলার, পরের সপ্তাহের জন্য ১৪ দশমিক ৬ ডলার নেয়া হয়।

বাংলাদেশ ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপো অ্যাসোসিয়েশনের সচিব রুহুল আমিন সিকদার বলেন, অফডকে খরচ কিছুটা বেশি। সেটা ব্যবসায়ীদের জন্য বোঝা হওয়ার কথা নয়। কারণ বন্দরে কনটেইনার পড়ে থাকলে এমনিতেই ডেমারেজ দিতে হয়। তার চেয়ে অফডক দ্রুত খালাস করা যায়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here