সঠিকভাবে কন্টেইনার না রাখায় ‘ওইএল হিন্দ’ জাহাজ দুর্ঘটনা

বে প্ল্যান’ মানেন না বার্থ অপারেটররা

0
886

নিজস্ব প্রতিবেদক
একটি বিদেশি জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দর জেটিতে ভিড়ার পরই একটি ‘বে প্ল্যান’ দেন; এই প্ল্যানে জাহাজের কোন স্তরে কোন ওজনের কন্টেইনার রাখা হবে তার পরিকল্পনা দেয়া হয়। এর প্রধান উদ্দেশ্য পণ্যভর্তি কন্টেইনার রাখার সমন্বয়ের মাধ্যমে জাহাজের ভারসাম্য নিশ্চিত করা। জাহাজকে সাগরপথে নির্বিঘ্নে চলার জন্য অবশ্যই ওই ভারসাম্য রক্ষা নিশ্চিত করেই চলেন জাহাজের ক্যাপ্টেন। কিন্তু সেই লোডিং প্ল্যানটি চট্টগ্রাম বন্দরে মানা হয় একেবারেই কম; যে কারণে বারবারই দুর্ঘটনা ঘটছে।

বন্দর মেরিন বিভাগ বলছে, চট্টগ্রাম বন্দর জেটিতে ২৩ আগস্ট ‘ওইএল হিন্দ’ জাহাজ এবং ২২ আগস্ট ‘ডিভন’ জাহাজ দুটি ভারসাম্য রক্ষা করতে না পেরেই দুর্ঘটনায় পড়ে। প্রধানত বে প্ল্যান না মানার কারণেই বারবার এই দুর্ঘটনা ঘটেছে। যদিও এখন পর্যন্ত বড় বিপর্যয় ঘটেনি কিন্তু ঘটতে কতক্ষন।
চট্টগ্রাম বন্দরের এক পাইলট বলছেন, জাহাজ পাইলটিং করতে গিয়ে প্রায় সময়ই বিদেশি ক্যাপ্টেনদের কাছ থেকে ‘বে প্ল্যান’ না মানার অভিযোগ পাই। জাহাজ চালাতে গিয়ে ভারসাম্যহীনতা আঁচ করতে পেরে বন্দর নিয়ন্ত্রন কক্ষকে জানাই কিন্তু কখনো এসব নিয়ে সমাধান মিলেনি। ফলে আমরা এতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি। মুলত বড় দুর্ঘটনা হয়নি বলেই হয়তো এসব বিষয় আড়ালে থেকেছে।

শিপিং লাইন, বন্দরের ট্রাফিক বিভাগ এবং বার্থ অপারেটরদের কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, একটি জাহাজের বে প্ল্যানে কোন স্তরে, কত ওজনের বা কোন ধরনের কন্টেইনার রাখা হবে তার একটি পরিকল্পনা দেয়া হয়। শিপিং লাইনের প্ল্যানিং বিভাগ এই পরিকল্পনা তৈরী করে; জাহাজের ক্যাপ্টেনের মাধ্যমে বার্থ অপারেটরকে জমা দেন। কারণ পণ্য উঠানামার কাজটি বন্দরের হয়ে করে থাকে বার্থ অপারেটররা।
নিয়ম অনুযায়ী, সবচে বেশি ওজন বা ১৮ টন ওজনের কন্টেইনার রাখা হয় জাহাজের একেবারে নীচের স্তরে। এরপর ১২ টন ওজনের কন্টেইনার রাখা হয় একধাপ ওপরের স্তরে। এরপর ক্রমান্বয়ে ১০ টন, ৮ টন এবং সবচে কম ওজনের কন্টেইনার রাখা হয় একেবারে ওপরের স্তরে। খালি কন্টেইনার রাখা হয় এসব কন্টেইনারের সাথে সমন্বয় করেই।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২২ আগস্ট ‘ডিভন’ জাহাজটি এবং  ২৩ আগস্ট ‘ওইএল হিন্দ’ জাহাজটি লোডিং প্ল্যান অনুযায়ী কন্টেইনার রাখা হয়নি। জাহাজের নীচের স্তরে খালি কন্টেইনার ও কম ওজনের কন্টেইনার দিয়ে সাজানো হয়েছে। শেষদিকে এসে কিছু রপ্তানি কন্টেইনার জেটিতে চলে আসায় সেগুলো জাহাজের ওপরের দিকে তুলে দেয়া হয়েছে। এরফলে জাহাজের ভারসাম্য রক্ষা হয়নি বলেই এককাত হয়ে জেটির সাথে লেগে গেছে। জেটিতে না লাগলে জাহাজ থেকেই ওপরের দিকের কন্টেইনারগুলো জেটিতে ধ্বসে পড়তে। অথবা রপ্তানি পণ্যভর্তি কন্টেইনারগুলো নদীতে পড়ে যেতে পারতো। এতে বিপুল ক্ষতি হতো এসব রপ্তানি পণ্যের।

জাহাজের পণ্য উঠা এবং ভারসাম্য রক্ষার কাজটি করে থাকে দুটি পক্ষ একটি বার্থ অপারেটর; আরেকটি হচ্ছে জাহাজের ডিউটি অফিসার। ‘ডিভন’ জাহাজের বার্থ অপারেটর ছিল এভারেস্ট এন্টারপ্রাইজ এবং ‘ওইএল হিন্দ’ জাহাজের বার্থ অপারেটর ছিল এএন্ডজে ট্রেডার্স।
লোডিং প্ল্যান না মানার কারণ জানতে চাইলে বার্থ অপারেটর প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ জামানকে অসংখ্যবার ফোন করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। ফলে তার মন্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।
জাহাজটির শিপিং এজেন্ট জিবিএক্স লজিস্টিকসের অ্যাসিসটেন্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট মুনতাসির রুবাইয়াত বলেন, ‘কী কারণে দুর্ঘটনা ঘটেছে আমি এ বিষয়ে মন্তব্য করবো না। বন্দর কর্তৃপক্ষই বিষয়টি খতিয়ে দেখবে বলেছেন।’

লোডিং প্ল্যান না মানার কারণ হিসেবে বন্দর ব্যবহারকারীরা বলছেন, বার্থ অপারেটরদের মধ্যে দ্রুত কাজ শেষ করার প্রতিযোগিতা থাকে। কারণ একটি জাহাজ দ্রুত করতে পারলে আরেকটি জাহাজ বার্থিং পাবে। বেশি জাহাজ পণ্য উঠানামা সম্পন্ন করতে পারলে বেশি লাভ। এই প্রবনতা থেকেই তারা সঠিক নিয়ম মানেন না।
জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বন্দর সচিব ওমর ফারুক বলেন, বন্দরের ডেপুটি কনজারভেটরের নেতৃত্বে বন্দর পরিচালক পরিবহন, জাহাজের মাস্টার, পিএন্ডআই ক্লাবের নেতৃত্বে ঘটনার কারণ উদঘাটনের জন্য বৈঠকে বসেছেন। ওই টেকনিক্যাল টীমের সুপারিশের ভিত্তিতেই পরবর্তী পদক্ষেপ নেয়া হবে।

এদিকে দুর্ঘটনার পর রবিবার রাতভর কাত হয়ে যাওয়া জাহাজ থেকে ৬৬ কন্টেইনার নামানো হয়েছে। এরপর জাহাজটির ভারসাম্য এসেছে, পোর্ট কন্ট্রোল এবং বিশেষজ্ঞ মাস্টার মেরিনার দিয়ে জাহাজটি ত্রুটিমুক্ত কিনা পরীক্ষা করে নিশ্চিত করা হয়েছে। কিন্তু এখনো বন্দর ছেড়ে যাবার অনুমতি পায়নি।
উল্লেখ্য, কন্টেইনার রাখার ভারসাম্য না থাকায়  ‘ওইএল হিন্দ’ নামের কন্টেইনার জাহাজ কাত হয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর জেটিতে। রবিবার সকালে বন্দরের সাধারন কন্টেইনার বার্থ (জিসিবি) এর ১১ নম্বর জেটিতে ‘ওইএল হিন্দ’ জাহাজে এই দুর্ঘটনা ঘটে। তবে অল্পের জন্য দুর্ঘটনা থেকে বেঁচে যায় ১২শ ৬৮ কন্টেইনারভর্তি বিদেশি এই জাহাজটি। রক্ষা পায় পণ্য উঠানামার কাজে ব্যবহৃত বন্দর জেটি। গতকাল রবিবার জাহাজটি রপ্তানি এবং খালি কন্টেইনার নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দর ছেড়ে যাওয়ার কথা ছিল।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here