লালদিয়া চরে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে চট্টগ্রাম বন্দরের হাতে সময় মাত্র এক সপ্তাহ

0
911

বিশেষ প্রতিনিধি
চট্টগ্রাম বন্দর এলাকার লালদিয়া চরে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে  ২০২০ সালে দুই মাসের সময়সীমা বেঁধে দিয়েছিল হাইকোর্ট।সেই সময়সীমা শেষ হচ্ছে ৮ মার্চ। এই সময়ের মধ্যে উচ্ছেদ অভিযান শেষ করে আগামী ৯ মার্চ আদালতকে অবহিত করতে হবে; সে হিসেবে উচ্ছেদ চালাতে বন্দরের হাতে সময় আছে সর্বােচ্চ এক সপ্তাহ। এই সময়েের মধ্যে উচ্ছেদ অভিযান চালাতে ব্যর্থ হলে চট্টগ্রাম বন্দর, জেলা প্রশাসনসহ সবাইকে আদালতে উপস্থিত হয়ে জবাব দিতে হবে। বিচারপতি মো. আশফাকুল ইসলাম ও বিচারপতি মোহাম্মদ আলীর সমন্বয়ে গঠিত ভার্চ্যুয়াল হাইকোর্ট বেঞ্চ গত ৮ ডিসেম্বর এ আদেশ দেন। অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে আদালতের ইতিপূর্বের নির্দেশনা বাস্তবায়নের অগ্রগতি বিষয়ক শুনানিতে ওই আদেশ দেওয়া হয়েছিল। আদালতে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের পক্ষে আইনজীবী মুরাদ রেজা এবং রিটের পক্ষে আইনজীবী মনজিল মোরসেদ শুনানিতে ছিলেন।

এদিকে উচ্ছেদের প্রতিবাদে স্থানীয় অধিবাসীরা মিলে ২২ ফেব্রুয়ারি মানববন্ধন করেছে। এরপরদিনই চট্টগ্রাম এসে নৌ পরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী উচ্ছেদ অভিযান নিয়ে সরকারের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছেন। কাউকে ছাড় দেয়া হবে না বলে হুঁশিয়ারি উচ্চারন করেছেন। মুলত এরপর থেকে উচ্ছেদ শুরু করতে প্রস্তুতি শুরু করেছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ।
নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, ‘লালদিয়ার চরে ভাড়া দিয়ে যারা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড করেছে, সেই স্বার্থান্বেষীদের তালিকা করা হয়েছে। গুটিকয়েক মানুষের জন্য চট্টগ্রাম বন্দরের সুনাম নষ্ট বরদাশত করা হবে না। লালদিয়া চরের অবৈধ উচ্ছেদ একটি চলমান প্রক্রিয়া, আমরা এত দিন ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছি।’

নৌ প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘কারো যদি কোনো ঠিকানা না থাকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলেছেন যে তাদের ঠিকানা দেবেন, কিন্তু অবৈধভাবে যারা দখল করে থাকবে তাদের আমরা উচ্ছেদ করব। যারা এত দিন এগুলো দখল করে রেখে ফায়দা লুটেছে তাদেরও তালিকা তৈরি করেছি। সময় নিয়ে সেই সব চিহ্নিত অপরাধীকেও আইনের আওতায় আনব, কিন্তু এ বাংলাদেশের সংবিধান মানুষের যে অধিকার দিয়েছে, তা সরকার খর্ব করবে না।’

প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘পুনর্বাসন আমরা তাদেরই করব, যারা গৃহহীন। যারা সচ্ছল তাদের পুনর্বাসনের সুযোগ নেই। আমরা যাদের পুনর্বাসন করব সেই তালিকা হয়েছে। যারা এখন আছে এর বেশির ভাগই ভাড়াটিয়া। কারা এ ধরনের সুযোগ নিয়ে ভাড়াটিয়াদের কাছ থেকে অর্থ আদায় করছে সেটির তালিকা করেছি, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেব। যারা বন্দর এলাকার জমি ব্যবহার করে অর্থ আদায় করছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেব।’

জানা গেছে, ২০১০ সালের ১৮ জুলাই হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের পক্ষে জনস্বার্থে করা এক রিট আবেদনে হাই কোর্টের একটি বেঞ্চ কর্ণফুলী নদী দখল, মাটি ভরাট ও নদীতে সব ধরনের স্থাপনা নির্মাণ বন্ধের নির্দেশ দেয়। সেই সঙ্গে স্থানীয় প্রশাসনকে পরবর্তী ছয় মাসের মধ্যে নদীর প্রকৃত সীমানা নির্ধারণ করে প্রতিবেদন দিতে বলে আদালত। আদালতের নির্দেশের পর চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন ২০১৪ সালের ৯ নভেম্বর কর্ণফুলীর দুই তীরে সীমানা নির্ধারণের কাজ শুরু করে। নেভাল অ্যাকাডেমি সংলগ্ন নদীর মোহনা থেকে মোহরা এলাকা পর্যন্ত অংশে ২০১৫ সালে জরিপের কাজ শেষ হয়। সেই জরিপে নদীর দুই তীরে প্রায় আড়াই হাজার অবৈধ স্থাপনা চিহ্নিত করে জেলা প্রশাসন। প্রতিবেদনটি ২০১৫ সালের ৯ নভেম্বর উচ্চ আদালতে দাখিল করা হয়। এরপর ২০১৬ সালের ১৬ আগস্ট হাই কোর্টের একটি বেঞ্চ কর্ণফুলীর দুই তীরে গড়ে ওঠা স্থাপনা সরাতে ৯০ দিনের সময় বেঁধে দেয়। সর্বশেষ ২০১৭ সালের ২৫ নভেম্বর উচ্ছেদ কার্যক্রম পরিচালনার জন্য এক কোটি ২০ লাখ টাকা অর্থ বরাদ্দ চেয়ে ভূমি মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেন চট্টগ্রামের সে সময়ের জেলা প্রশাসক।

শেষ পর্যন্ত উচ্ছেদ কার্যক্রম শুরু হলেও বাধার মুখে তা বন্ধ হয়ে যায়। এরপর রিট আবেদনকারী পক্ষের এক আবেদনে গত বছরের ৯ এপ্রিল কর্ণফুলী তীরে অবৈধ স্থাপনা অবিলম্বে উচ্ছেদ করতে বন্দর চেয়ারম্যানকে নির্দেশ দেয় হাই কোর্ট। উচ্ছেদ করে ৩০ দিনের মধ্যে আদালতে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়। কিন্তু পুরোপুরি উচ্ছেদ না করে বন্দর কর্তৃপক্ষ আদালতে সময় চেয়ে আবেদন করে। তখন আদালত তাদের তিন সপ্তাহের সময় বেঁধে দিয়ে বাস্তবায়ন প্রতিবেদন দিতে বলে। সে সময়ের মধ্যে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ না করে ফের সময়ের আবেদন করায় গত ১১ ফেব্রুয়ারি আদালত চট্টগ্রাম বন্দরের চেয়ারম্যানকে তলব করে।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান জুলফিকার আজিজ এদিন আদালতে উপস্থিত হয়ে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের বিষয়ে নিজের বক্তব্য তুলে ধরেন। পরে আদালত কর্ণফুলীর তীরে বন্দর এলাকায় অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে তিন মাস সময় বেঁধে দেয়। ওই সময়ের মধ্যে উচ্ছেদ কাজ শেষ করে বন্দর কর্তৃপক্ষকে আদালতের আদেশের বাস্তবায়ন প্রতিবেদন দিতে বলে ১২ মে পরবর্তী আদেশের জন্য রাখে। এরপর কভিডের কারণে সেটি স্থগিত হয়ে যায়। এরপর উচ্ছেদ নিয়ে  গত ডিসেম্বরে নতুন রায় এসেছিল।

আইনজীবী মনজিল মোরসেদ বলেন, আমরা আশা করছি চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ আর সময়েক্ষপন করবে না। তার উচ্ছেদ শেষ করতে না পারলে ৯ মার্চ আদালতে গিয়ে জবাব দিতে হবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here