রামগড় সেতু উদ্বোধন। চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ট্রানজিট পণ্যপরিবহনে দুরত্ব কমবে ১১৫ কিলোমিটার

0
735

বিশেষ প্রতিনিধি

চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ট্রানজিট বা ট্রানশিপমেন্ট পণ্য সড়কপথে ভারতের ত্রিপুরা পৌঁছতে ২১৫ কিলোমিটার দুরত্ব পাড়ি দিতে হতো। ফেনী নদীর ওপর রামগড় মৈত্রী সেতু চালুর পর সেই দুরত্ব অন্তত ১শ কিলোমিটার কমবে। ফলে বাংলাদেশ-ভারত দুই দেশের ব্যবসায়ীরা সাশ্রয়ে আমদানি-রপ্তানি পণ্য পরিবহনের সুযোগ পাবেন। যাত্রী পরিবহন সুবিধাও নিশ্চিত হবে। তার আগে দুইদেশের বাণিজ্যিক ভারসাম্য দুর করা এবং সেতুর দুই প্রান্তে শুল্ক স্টেশনসহ অবকাঠামো নির্মান জরুরি।

জানতে চাইলে সী কম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমিরুল হক বলেন, ‘একটি সেতু চালু হওয়া মানেই নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দেয়া। রামগড় মৈত্রী সেতুর তারই দৃষ্টান্ত। এরফলে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে পণ্য কম সময়ে ভারতের উত্তর পূআর্ঞ্চলীয় সাত রাজ্যে পণ্য পরিবহন করা যাবে। আমরা পণ্য রপ্তানি করতে পারবো কম সময়ে। কিন্তু সেতু-সড়ক চালু করলেই হবে না। দুদেশের মধ্যে বানিজ্যিক ভারসাম্যহীনতা দুর করতে পারলেই সত্যিকারের সুফল পাবে দুদেশ।’

ব্যবসায়ীরা বলছেন, চট্টগ্রাম থেকে ট্রানজিট পণ্য এতদিন আখাউড়া স্থলবন্দর দিয়ে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের আগরতলা পৌঁছাতো। গত ২০২০ সালের জুলাইয়ে প্রথম চালানটি সেখানে পৌঁছতে ২১৫ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়েছিল। ফেনী নদীর ওপর বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী সেতু গতকাল মঙ্গলবার চালুর পর মাত্র ১শ কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে ত্রিপুরা রাজ্যের সাবরুমে পৌঁছা সম্ভব হবে। অর্থ্যাৎ নতুন এই মৈত্রী সেতু চালুর ভারতের সাতরাজ্যে পৌঁছতে সড়কপথের দুরত্ব ১১৫ কিলোমিটার দুরত্ব কমে আসবে। এতে সাত রাজ্যে যেমন দ্রুত পণ্য রপ্তানি সহজ হবে; তেমনি আমদানিও করা যাবে দ্রুত। একইসাথে ভারতও চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে পণ্য দ্রুত নিজেদের শহরে নিতে পারবে।

বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে চার হাজার কিলোমিটার স্থল সীমান্ত রয়েছে। ফেনী নদীর ওপর নির্মিত এটি একমাত্র সেতু যেটি দুদেশকে সড়কপথে যুক্ত করেছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, এই মৈত্রী সেতুর মাধ্যমেই প্রতিবেশি দুই দেশ বাণিজ্যিকভাবে লাভবান হবে। এতে পণ্য পরিবহনই নয়; ভ্রমন-চিকিৎসা নিতে যাওয়া বাংলাদেশি যাত্রীরাও লাভবান হবে।

চট্টগ্রাম সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের তত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হাফিজুর রহমান বলেন, ‘সেতু চালুর পর চট্টগ্রাম বন্দর থেকে পণ্য পৌঁছানোর সময় অেেনক কমে আসবে। আগে চট্টগ্রাম-ঢাকা চার লেইন মহাসড়ক দিয়ে আখাউড়া দিয়ে গেলেও এখন একই মহাসড়ক ব্যবহার করে সরাসরি খাগড়াছড়ির রামগড় দিয়েই অনেক কম সময়ে পৌঁছানো সম্ভব হবে।’

তিনি বলছেন, রামগড় সেতু চালুর আগে থেকেই আরো তিনটি বিকল্প সড়ক আমরা নির্মান করছি। এরমধ্যে সবচে বড় প্রকল্প হচ্ছে ৮৪৫ কোটি টাকার রামগড়-বারৈয়ারহাট সড়ক। আর হাটহাজারী-ফটিকছড়ি সড়ক দিয়েও রামগড় যাওয়া সহজ হচ্ছে; ডিসেম্বরে এই সড়কের কাজ শেষ হবে। একইসাথে ফটিকছড়ি বারৈয়ারহাট সড়কটির কাজও ৮০ ভাগ শেষ হয়েছে। সুতরাং এসব প্রকল্প চালু হলে শুধু ট্রানজিট নয়; সড়ক যোগাযোগের কারণে পুরো অঞ্চলের চিত্রই আমুল পরিবর্তন হবে।

জানা গেছে, ফেনী নদীর ওপর বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী সেতু চালুর আগেই ভারত ত্রিপুরার সাবরুম প্রান্তে একটি ইন্টিগ্রেটেড চেকপোস্টও নির্মান করেছে। কিন্তু বাংলাদেশ সরকার রামগড় প্রান্তে স্থলবন্দর ঘোষণা দিলেও কোন অবকাঠামো নির্মান এখন পর্যন্ত শুরু করেনি। ফলে সেতু চালু হলেও দুইদেশের পণ্য কিংবা যাত্রী চলাচল কিভাবে শুরু হবে তা এখনো নিশ্চিত নয়।

ঘোষিত রামগড় স্থলবন্দর তদারকি করবে চট্টগ্রাম কাস্টমস এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেট। তাদের প্রস্তুতি জানতে চাইলে কাস্টমসের কমিশনার আকবর হোসেন বলেন, ‘সরকার ঘোষণা দিয়েছে স্থলবন্দর হিসেবে। লোকবল, অবকাঠামো নির্মানেরও পরিকল্পনা চলছে। কিন্তু কবে নাগাদ সেটি চুড়ান্ত হবে এখনই বলা যাচ্ছে না। তবে তার আগপর্যন্ত খাগড়াছড়ি ভ্যাট দপ্তর থেকেই সেটি তদারকি করা হবে।

কলকাতা থেকে আগরতলা পণ্য পৌঁছাতে ১৬ শ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হয়; মূলত বিপুল পণ্য পরিবহন ব্যয় কমাতেই ভারতের সাত রাজ্য চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহার করে পণ্য নিতে চাইছে। ২০২০ সালে জুলাই মাসে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে এক চালান ট্রানজিট পণ্য আখাউড়া স্থলবন্দর দিয়ে ত্রিপুরার আগরতলা পৌঁছেছিল। চালানটি জাহাজযোগে কলকাতা থেকে চট্টগ্রাম বন্দর পৌঁছে; সেখান থেকে সড়কপথে প্রথমবার আগরতলা গিয়েছিল। সেই চালানটি ছিল পরীক্ষামূলক। রামগড় সেতু চালুর পর নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলবে।

বাংলাদেশ থেকে সিমেন্ট, স্টিল বার, বিস্কুটসহ প্রচুর পণ্য ভারতের সাতরাজ্যে রপ্তানি হয়। এতদিন সেটি আখাউড়া দিয়ে গেলেও এখন রামগড় মৈত্রী সেতু দিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড গত ১৩ জুলাই এক আদেশে ভারতীয় ট্রানজিট বা ট্রান্সশিপমেন্টের ‘পরীক্ষামূলক পণ্য চালানের’ জন্য মাসুল নির্ধারণ করে দিয়েছিল। এই সাতটি মাসুল হলো প্রতি চালানের প্রসেসিং ফি ৩০ টাকা, প্রতি টনের জন্য ট্রান্সশিপমেন্ট ফি ৩০ টাকা, নিরাপত্তা মাসুল ১০০ টাকা প্রতি টন, এসকর্ট মাসুল প্রতি টন ৫০ টাকা এবং অন্যান্য প্রশাসনিক মাসুল প্রতি টন ১০০ টাকা। এ ছাড়া স্ক্যানিং ফি (প্রতি কনটেইনার) ২৫৪ টাকা এবং বিধি অনুযায়ী ইলেকট্রিক সিলের মাসুল প্রযোজ্য হবে। এই নির্ধারিত সাতটি মাসুল অনুযায়ী একটি কনটেইনার থেকে শুধু চট্টগ্রাম কাস্টমস রাজস্ব আয় করবে সাত হাজার ৩৪ টাকা। এর বাইরে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ পণ্য উঠানামা মাসুল, রিভার ডিউজ, পোর্ট ডিউজ আদায় করবে। কিন্তু সেটি ছিল একটি চালানের জন্য। নিয়মিত ট্রানজিট পণ্য পরিবহন শুরু হলে এর হেরফের হতে পারে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here