মাতারবাড়ীতে দেশি-বিদেশি যৌথ উদ্যোগে নির্মিত হচ্ছে এলপিজি টার্মিনাল

0
709

বিশেষ প্রতিনিধি
কক্সবাজারের মাতারবাড়ীতে বছরে ১২ লাখ টন ধারণক্ষমতার তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) টার্মিনাল নির্মাণ করছে সরকার। বাংলাদেশে পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের সঙ্গে তিনটি প্রতিষ্ঠানের সাথে জাপানের মারুবেনি, সিঙ্গাপুরের ভিটল (এশিয়া) ও বাংলাদেশের পাওয়ার কোর এর সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে এই এলপিজি টার্মিনালটি নির্মাণ হচ্ছে। এতে ব্যয় হবে প্রায় ২ হাজার ৬০০ কোটি টাকা।
বাংলাদেশে পেট্রোলিয়াম করপোরেশন বলছে, বিল্ট অন ট্রান্সফার পদ্ধতিতে এই এলপিজি টার্মিনালটি নির্মাণ করা হবে। বিপিসি শুধু টার্মিনাল নির্মাণে জমি জোগাড় করে দেবে আর কোনো বিনিয়োগ করবে না। বাকি তিনটি প্রতিষ্ঠান টার্মিনাল নির্মাণের অর্থ জোগাড় করবে। যৌথভাবে টার্মিনালটি পরিচালনা করা হবে। তবে ১৫ বছর পর টার্মিনালটির সম্পন্ন মালিকানা বিপিসির হাতে ছেড়ে দেবে বাকি তিন প্রতিষ্ঠান।
জানা গেছে, বর্তমানে প্রতি টন এলপি গ্যাস পরিবহনে খরচ হয় সাড়ে ৮ থেকে ৯ হাজার ৩৩৫ টাকা। টার্মিনাল নির্মাণ হলে টনপ্রতি পরিবহন খরচ কমবে প্রায় সাড়ে ৩ হাজার টাকা।এটি নির্মাণ হলে টনপ্রতি প্রায় সাড়ে ৩ হাজার টাকা কমবে এলপি গ্যাসের দাম।
জানতে চাইলে বিদ্যুৎ, জ্বালানী ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেন, দেশে প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুদ শেষ হয়ে আসছে। জ্বালানী নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সরকার বড় আকারে এলপিজি টার্মিনাল নির্মাণ করতে যাচ্ছে। এখন এলপি গ্যাস জনপ্রিয় জ¦ালানি হিসেবে সারা দেশে ব্যবহৃত হয়। যদি সরকারের নিয়ন্ত্রণ রেখে টার্মিনাল নির্মাণ করা যায় তাহলে এলপি গ্যাসের দাম কম হবে। এতে সাধারণ মানুষ উপকৃত হবেন।
জানা গেছে, মাতারবাড়ী এলাকায় সাগরে টার্মিনাল নির্মাণ করা হবে। হিমায়িত আকারে এলপি গ্যাস নিয়ে সাগরে ভাসমান থাকবে জাহাজ। টার্মিনালের মাধ্যমে পুনরায় তরল পেট্রোলিয়াম গ্যাসে বা এলপিজিতে পরিণত করা হবে। টার্মিনাল থেকে দেশের ভেতর এলপি গ্যাস সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো আন্তর্জাতিক দামে পাইকারি কিনে নেবে। টার্মিনাল থেকে দেড় থেকে চার হাজার টনের জাহাজে করে নিজেদের কারখানায় এলপিজি নিয়ে বোতলজাত করবে। এরপর সারা দেশে গ্রাহকের কাছে এলপিজি সরবরাহ করবে।
উল্লেখ্য, গত ৩ মার্চ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মাতারবাড়ীতে এলপিজি টার্মিনাল নির্মাণের অনুমোদন দিয়েছেন।  টার্মিনালের মালিকানা মারুবেনির ৪০ শতাংশ, ভিটল ও পাওয়ার কোর ৩০ শতাংশ এবং বিপিসির ৩০ শতাংশ থাকবে। তবে এজন্য বিপিসির কোনো অর্থ বিনিয়োগ করা লাগবে না।
এর আগে মাতারবাড়ীতে এলপিজি টার্মিনাল নির্মাণে সরকারের বিদ্যুৎ, জ্বালানী ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের জ্বালানী বিভাগে পাঁচটি প্রস্তাব জমা পড়ে। গত বছর ২২ জানুয়ারি জ্বালানী বিভাগ এসব প্রতিষ্ঠানকে ২০২০ সালের ১৮ মার্চের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ প্রস্তাব জমা দেওয়ার অনুরোধ জানায়। যৌথভাবে পূর্ণাঙ্গ প্রস্তাব জমা দেয় তিনটি প্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠানগুলো হলো জাপানের মিতসুই ও কোরিয়ার এসকে গ্যাস, জাপানের সুমিতমো করপোরেশনের মালিকানাধীন জিওয়াইএক্সআইএস ও নেদারল্যান্ডসের এসএইচভি এনার্জি এবং মারুবিনি, ভিটল ও পাওয়ার কো।
জ্বালানি বিভাগ ২০২০ সালের ৭ অক্টোবর বিপিসিকে লেখা এক চিঠিতে জানায়, যেসব প্রতিষ্ঠানের আগে বাংলাদেশে পাইকারি এলপিজি সরবরাহের অভিজ্ঞতা রয়েছে এমন প্রতিষ্ঠানকে এলপিজি টার্মিনাল অগ্রাধিকার দিতে হবে। এলপিজি টার্মিনাল নির্মাণে মারুবিনি, ভিটল ও পাওয়ার কোকে মনোনীত করে। টার্মিনাল নির্মাণে এশিয়ান উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি), বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স করপোরেশন (আইএফসি) ও জাপানের জাইকার কাছে প্রকল্পের জন্য ঋণ চাওয়া হবে।
প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঠানো টার্মিনাল নির্মাণের সারসংক্ষেপে বলা হয়েছে, হিমায়িত করা এলপি গ্যাস নিয়ে জাহাজ সাগরে ভাসমান অবস্থায় থাকবে। এসব জাহাজের ধারণক্ষমতা হবে ৩৫ থেকে ৪০ হাজার টন। টার্মিনালে এলপি গ্যাসের মজুদ ক্ষমতা থাকবে ৫০ হাজার টন। এতে এলপি গ্যাস পরিবহন সাশ্রয় হবে।
বর্তমানে দেশের এলপিজি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো আন্তর্জাতিক বাজার থেকে এলপি গ্যাস কিনে নিজেদের ব্যবস্থায় জাহাজে করে দেশে আনে। বড় আকারে এলপি গ্যাস আনা গেলে পরিবহন খরচ কমে যাবে বলে মনে করে বিপিসি। আগামী তিন বছরের মধ্যে এ টার্মিনাল নির্মাণকাজ শেষ বলে জানিয়েছে সরকারের জ্বালানী বিভাগ।
দেশে বর্তমানে জেটি সুবিধা রয়েছে ১৯টি ও জেটি সুবিধা নেই ৭টি প্রতিষ্ঠানের। সব মিলিয়ে ২৬টি প্রতিষ্ঠানের এলপিজি বটলিং কেন্দ্র রয়েছে। এছাড়া আরও কিছু এলপিজি বটলিং কেন্দ্র শিগগিরই উৎপাদনে আসবে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের ব্যবস্থাপনায় সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্য থেকে এলপি গ্যাস আমদানি করছে। আমদানি করা এসব এলপি গ্যাস সাধারণত ২ থেকে ৩ হাজার টন করে জাহাজে আনা হয়। এতে টনপ্রতি খরচ বেড়ে যায়। টার্মিনাল স্থাপন হলে ৩৫ থেকে ৩৮ হাজার টন এলপি গ্যাস আমদানি করা হবে। এতে পরিবহন অনেক কমে আসবে। তখন বাজারে এলপি গ্যাসের দাম কোম্পানিভেদে ভিন্নতা কমে আসবে বলেও বিপিসির কর্মকর্তাদের দাবি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here