বিশ্বের বন্দরে অচল পদ্ধতি এখনো সচল চট্টগ্রাম বন্দরে

0
558

বিশেষ প্রতিনিধি
চট্টগ্রাম বন্দরের সংরক্ষিত এলাকার ভিতর কন্টেইনার খুলে পণ্যের কায়িক পরীক্ষা এবং আমদানি পণ্য ভাগাভাগি করে বন্দর থেকে সরবরাহ নেয়ার পদ্ধতি বিশ্বের কোন সমুদ্রবন্দরে এখন চালু নেই। অথচ বিশ্বে বিলুপ্ত হওয়া পদ্ধতিতে এখনও পণ্য ছাড় হচ্ছে চট্টগ্রাম বন্দরে। এই পুরনো পদ্ধতির কারণে দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরটি তার নিজস্ব গতিতে এগুতে পারছে না।
বন্দর কর্তৃপক্ষ বলছে, মোট কন্টেইনার উঠানামার ৬৮ শতাংশই এই পদ্ধতিতে ছাড় হচ্ছে। এসব পণ্য ছাড় করতে বন্দরের সংরক্ষিত এলাকার ভিতর প্রতিদিন ১২ হাজার মানুষ এবং ছয় হাজার ট্রাক-কাভার্ড ভ্যান প্রবেশ করছে। কন্টেইনার খুলে পণ্য নামিয়ে কাস্টমসের পরীক্ষা এবং সেই পণ্য মাথায় বোঝাই করে ট্রাকে তুলতে বিপুল শ্রমিক কাজ করছে। বিশাল এই কর্মযজ্ঞ করতে গিয়ে বন্দরের ভিতর বিপুল স্থান তাদের দখলে থাকছে। এতে বন্দরে স্বাভাবিক কাজে চরম ব্যাঘাত ঘটছে; বন্দরের ভিতর নিরাপত্তা শঙ্কাও তৈরি হয়েছে। বন্দরের বাইরে বিমানবন্দরমুখি প্রধান সড়কে নিয়মিতই যানজট তৈরী হচ্ছে।
বন্দর পরিবহন বিভাগের পর্যবেক্ষন হচ্ছে, আমরা হিসাব করে দেখেছি এই ৬৮ শতাংশ কন্টেইনার বন্দর থেকে সরবরাহ নিতে দিনে ছয় হাজার ট্রাক-কাভার্ড ভ্যান বন্দরে প্রবেশ করে। বন্দরের প্রত্যেক বর্গমিটার এই মুহূর্তে আমাদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অথচ এসব ট্রাক-কাভার্ডভ্যান বন্দরের গুরুত্বপূর্ণ ৬০ হাজার বর্গমিটার স্থান দখল করে রাখছে প্রতিদিন। গাড়ির সাথে প্রবেশ করে চালক-সহকারী এবং এসব পণ্য বোঝাই-নামানোর কাজে বিপুল নিয়োজিত শ্রমিক। বন্দরের ভিতর থেকে এই পুরনো পদ্ধতি সরাতে পারলে বিদ্যমান সক্ষমতা ব্যবহার করেই চট্টগ্রাম বন্দরে বাড়তি তিন থেকে চার লাখ একক কন্টেইনার উঠানামা করা সম্ভব। আর বিদ্যমান অবস্থায় আগামী দুই বছর এভাবেই বন্দরের প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা যাবে।
সর্বশেষ গত আগস্ট মাসে চট্টগ্রাম বন্দর পরিদর্শনের পর আমেরিকান কোস্টগার্ডের প্রতিনিধিদল (আইএসপিএস টিম) এই অচল পদ্ধতি দ্রুত সরিয়ে নিতে আবারও তাগাদা দিয়েছে। বন্দরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একবছর আগেও তারা একই তাগাদা দিয়েছিল কিন্তু সুফল মিলেনি।
কেন সম্ভব হচ্ছে না জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বন্দর ট্রাফিক বিভাগের এক কর্মকর্তা বলছেন, ‘বন্দরের মুল কাজই হচ্ছে পণ্য উঠানামা এবং ডেলিভারি দেয়া। কন্টেইনার খুলে পণ্য ডেলিভারি প্রথা সচল নেই বিশ্বের কোথাও; ভারতের কোন বন্দরেও নেই, দুভার্গ্যবশত কেবল আমরাই চালু রেখেছি।  বন্দরের সংরক্ষিত এলাকা থেকে এই কাজটি সরিয়ে বেসরকারী কন্টেইনার ডিপো এবং আমদানিকারকের চত্বরে নেয়ার সিদ্ধান্ত দিলেই মুক্তি মিলে। পণ্য কোথায় নিয়ে ছাড় হবে সেই এখতিয়ার জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের। ফলে সিদ্ধান্ত তাদের কাছ থেকেই আসতে হবে।’
বন্দর কর্তৃপক্ষের হিসাবে, মোট আমদানি কন্টেইনারের ২০ শতাংশ জাহাজ থেকে নামিয়ে বেসরকারী কন্টেইনার ডিপোতে নিয়ে খালাস করা হয়। ৮ শতাংশ ছাড় করা হয় অনসেসিস বা আমদানিকারকের চত্বরে নিয়ে গিয়ে এবং ৪ শতাংশ ছাড় করা হয় এলসিএল কন্টেইনার। বাকি ৬৮ শতাংশ ছাড় করা হয় বন্দরের সংরক্ষিত এলাকার ভিতর ইয়ার্ডে। এসব কন্টেইনারে একজন আমদানিকারক (এফসিএল) এর পণ্য থাকে। ফলে সেগুলো বন্দরে খোলার প্রয়োজন পড়ে না।
তাহলে কন্টেইনার খোলার প্রয়োজন পড়ে কেন? জানতে চাইলে জেটিতে কর্মরত কাস্টমসের অতিরিক্ত কমিশনার শিপিং এক্সপ্রেসকে বলছেন, ‘আমদানি পণ্য রাখার দায়িত্ব হচ্ছে বন্দরের, আর সেই পণ্য ঘোষণামতো সঠিক আছে কিনা যাচাই করা এবং সরকারের রাজস্ব ফাঁকি রোধ করার দায়িত্ব হচ্ছে কাস্টমসের। আমরা এখন সেই কাজটি করছি বন্দর এবং বন্দরের বাইরে বেসরকারী কন্টেইনার ডিপোতে। এখন জাতীয় রাজস্ব বোর্ড যদি নির্দেশ দেয় সব ধরনের আমদানি পণ্য বেসরকারী কন্টেইনার ডিপো বা বে টার্মিনালে নিয়ে খালাস করতে হবে; কাস্টমস সেখানে একই দায়িত্ব পালন করবে। তবে আমদানিকারকের চত্বরে গিয়ে পণ্য যাচাই করা খুবই অসম্ভব বিষয়।’
বন্দর কর্মকর্তারা মনে করছেন, কাস্টমস ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে আত্নবিশ্বাসের ঘাটতির কারণেই এই পদ্ধতি এখনো চালু রেখেছে রাজস্ব বোর্ড। পাশ্ববর্তী ভারতে এই পদ্ধতি অনেক আগেই বিলুপ্ত করা হলেও চট্টগ্রাম বন্দরে রয়ে গেছে।
কাস্টমস কর্মকর্তারা বলছেন, এই পদ্ধতি বন্ধ করার সুযোগ নেই: কারণ দেশের সব ব্যবসায়ীরা তো রাতারাতি সাধু বা ভালো হয়ে যায়নি। এই পদ্ধতি বন্দরের ভিতর থেকে স্থানান্তর করে বেসরকারী ডিপোতে নেয়া যায়। এজন্য বর্তমান ডিপোর সংখ্যা ও সক্ষমতা বাড়াতে হবে। কারণ বর্তামেন থাকা ১৮টি কন্টেইনার ডিপোতে সেই বিশাল কাজ করা সম্ভব নয়।
বছরের পর বছর এ নিয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সিদ্ধান্ত না পাওয়ায় বন্দর কর্তৃপক্ষ নিজেরাই একটি সমাধান বের করতে চাইছে। সেটি হচ্ছে বন্দরের বাইরে পতেঙ্গা উপকূলজুড়ে নির্মান পরিকল্পনায় থাকা বে টার্মিনালে এসব পণ্য নিয়ে গিয়ে ছাড় দেয়া। কিন্তু সেই বহুল কাঙ্খিত ‘বে টার্মিনাল’ এ ইয়ার্ড নির্মান কাজ এখনো শুরু হয়নি। ফলে এই পদ্ধতি কবে বন্ধ হবে তা জানে না কেউ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here