বহির্নোঙরে ‘গ্রীন ফনিক্স’ জাহাজ থেকে ‘তিনটি বাল্ক হেডে’ অবৈধভাবে পণ্য নামানো হচ্ছে

নুর মোহাম্মদ-১', 'বিসমিল্লাহ' ও 'মোহাম্মদ আলাউদ্দিন-১'

0
1575

বিশেষ প্রতিনিধি
বহির্নোঙরে বড় জাহাজ থেকে ছোট জাহাজে পণ্য নামিয়ে পরিবহনের কাজটি করে লাইটার বা ছোট জাহাজ। এখন সেই কাজটি করছে বালিবাহী জাহাজ; যাকে ইংরেজিতে বাল্কহেড বলে। আর প্রচলিত ভাষায় বলা হচ্ছে ‘ভলগেট’। বালির জাহাজে বালি ছাড়া অন্য পণ্য পরিবহন সম্পূর্ণ অবৈধ এবং নিষিদ্ধ। কিন্তু কিছু শিপিং এজেন্ট; ঠিকাদার এবং শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটর মিলে অবৈধ এই কাজটি করে বন্দরে জাহাজের প্রবেশপথ এবং নৌপথকে পুরােপুরি ঝুঁকির মুখে ফেলে দিয়েছে।
নৌ বাণিজ্য অধিদপ্তর জাহাজ মালিক, শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটর, শিপিং এজেন্ট, ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট সেল এবং লাইটার জাহাজ ঠিকাদারদের সাথে বৈঠক করে এই বালির জাহাজ চলাচল বন্ধের কঠোর সিদ্ধান্ত নিলেও রহস্যজনক কারণে সেটি বাস্তবায়ন হচ্ছে না।
বন্দর চ্যানেলে বালির জাহাজ বন্ধের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের দায়িত্ব প্রধানত নৌ বানিজ্য অধিদপ্তরের। কিন্তু এখন পর্যন্ত তাদের তদারকি চোখে পড়েনি। জানতে চাইলে নৌ বানিজ্য অধিদপ্তরের প্রিন্সিপাল অফিসার ক্যাপ্টেন গিয়াস উদ্দিনের ব্যক্তিগত মোবাইলে ফোন দিলে তিনি সাড়া না দেয়ায় তাদের পদক্ষেপ সম্পর্কে জানা যায়নি।
বন্দর চ্যানেল নিরাপদ রাখতে চট্টগ্রাম বন্দরের ডেপুটি কনজারভেটর ক্যাপ্টেন ফরিদুল আলম শিপিং এক্সপ্রেসকে বলছেন, বাল্কহেড শুধুমাত্র বালি তোলার কাজে ব্যবহৃত। পণ্য পরিবহনের প্রশ্নই উঠে না; আর বন্দর চ্যানেলে চলাচল তো সম্পূর্ণ অবৈধ। আমরা বাল্কহেড চলাচল বন্ধে বন্দর ম্যাজিস্ট্রেট দিয়ে অনেকগুলো অভিযান চালিয়েছি; জরিমানা আটক করেছি কিন্তু চলাচল বন্ধ করা যায়নি।
তিনি বলেন, শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটর, আমদানিকারক, শিপিং এজেন্ট যদি এসব ঝুঁকিপূর্ণ জাহাজে পণ্য পরিবহন বন্ধ করতে আন্তরিক না হন তাহলে আমাদের একার পক্ষে সেগুলো সম্পূর্ণ বন্ধ করা সম্ভব নয়। কারণ আমরা কতদিন কবার অভিযান চালাবো। তারা নিজেরাই আগে সিদ্ধান্ত নিক নিরাপদে পণ্য পরিবহন করবেন নাকি কম খরচে ঝুূঁকি নিয়ে পণ্য পরিবহন করবেন?
গত দুদিনে বহির্নোঙরে বড় জাহাজ থেকে বালক হেডে পণ্য নামানোর বেশ কিছু ছবি এবং কিছু ভিডিও শিপিং এক্সপ্রেসের কাছে এসেছে। এরমধ্যে একটি ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, ‘গ্রীন ফনিক্স’ নামের বড় জাহাজ থেকে তিনটি বাল্কহেডে পণ্য নামানো হচ্ছে। এসব বাল্কহেড হচ্ছে, ‘নুর মোহাম্মদ-১’, ‘বিসমিল্লাহ’ ও ‘মোহাম্মদ আলাউদ্দিন-১’ থেকে পণ্য নামানোর কাজটি করেছে শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটর হাজী ইদ্রিস এন্ড সন্স। জানতে চাইলে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক খলিলুর রহমান নাহিদের মোবাইলে ফোন দেয়া হলে তিনি সাড়া দেননি। আর ৫৪ হাজার ৬শ টন সিমেন্ট তৈরীর কাঁচামাল এগ্রিগেট নিয়ে আসা ‘গ্রীন ফনিক্স’ জাহাজটির শিপিং এজেন্ট হচ্ছে এশিয়া বাল্ক।
জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জসহ দেশের দক্ষিণাঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে কোনো ধরনের কারিগরি নকশা ছাড়াই মিস্ত্রি ও ওয়েল্ডারের পরিকল্পনায় এসব বাল্কহেড নির্মাণ করা হচ্ছে। যারা এ নৌযান তৈরির সঙ্গে জড়িত তাদের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাও নেই। নির্মাণকারী ডকইয়ার্ডগুলোরও কোনো বৈধ অনুমতির কাগজপত্র নেই। অন্তত দুই শতাধিক বাল্কহেড এখন পণ্য পরিবহনের অবৈধ কাজটি করছে।
বালির জাহাজে পণ্য পরিবহন সম্পূর্ণ অবৈধ উল্লেখ করে ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট সেলের নির্বাহী প্রধান মাহবুব রশীদ খান শিপিং এক্সপ্রেসকে বলেন, বালির জাহাজের ত্রুটিপূর্ণ নির্মানশৈলীর কারণে সেই জাহাজে অন্য পণ্য পরিবহনের অনুমোদন নেই। সামান্য বৃষ্টি বা ঝড়ো বাতাসে সেগুলো ডুবে যেতে পারে। জাহাজটির পরিচালনাকারীরা সুকানিরা বহির্নোঙরে এসব জাহাজ পরিচালনায় একেবারে অনভিজ্ঞ। আর জাহাজটিতে যখন বালি বোঝাই হয় তখনই সেগুলো প্রায়ই ডুবো অবস্থায় চলাচল করে; যা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। বন্দর চ্যানেলটি আমদানি-রপ্তানি পণ্যবাহি দেশি- বিদেশি জাহাজ চলাচলের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ; এই চ্যানেল কোন দুর্ঘটনা শুধু বন্দর নয়; দেশের অর্থনীতির জন্য বিপদ ডেকে আনবে।
তিনি বলছেন, একশ্রণীর ব্যবসায়ী শুধুমাত্র আর্থিক লাভের জন্যই বাল্কহেডে পণ্য পরিবহন করছে। তারা ঝুঁকি, বন্দর চ্যানেল, দেশের অর্থনীতি কোন কিছুই বিবেচনায় আনে না। সুতরাং তাদেরকে আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তি ছাড়া কোন বিকল্প নেই

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here