বন্দরের জলসীমায় জাহাজ দুর্ঘটনা বাড়ছে

0
1278

বিশেষ প্রতিনিধি
চট্টগ্রাম বন্দর জলসীমায় পণ্যবাহি জাহাজ দুর্ঘটনা হঠাৎ করে বেড়ে গেছে। জলসীমার ‘আলফা অ্যাংকরেজে’ সবচে বেশি দুর্ঘটনার ঘটনা ঘটছে। মুলত চারটি অ্যাংকরেজের মধ্যে আলফা অ্যাংকরেজেই একসাথে অনেক জাহাজ নোঙরের প্রতিযোগিতা করতে গিয়েই এসব দুর্ঘটনা ঘটছে। বন্দর কর্তৃপক্ষ চারটি অ্যাংকরেজে জাহাজ নোঙরে শৃঙ্খলা আনতে ২০১৯ সালে নতুন নিয়ম চালুর আদেশ জারি করেছে কিন্তু শিপিং এজেন্টদের বিরোধিতার কারণে কার্যকর করতে পারেনি। এখন দুর্ঘটনা বাড়ায় বিশ্বের শিপিং সেক্টরে চট্টগ্রাম বন্দরের সুনাম ক্ষুন্ন হচ্ছে।

জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বন্দরের সদস্য (হারবার ও মেরিন) কমডোর মোস্তাফিজুর রহমান শিপিং এক্সপ্রেসকে বলেন, ‌’শীতকালে সাগর শান্ত থাকে বলে সাধারনত দুর্ঘটনা ঘটে না। এখন দুর্ঘটনাগুলো দেখে আমরা নিজেরাই সিদ্ধান্ত নিয়েছি বন্দর জলসীমায় শৃঙ্খলা ফেরাতে আমাদের নির্দেশনার বাস্তবায়ন হতে হবে এর কোন বিকল্প নেই। তবে এর আগে আমরা অবশ্যই সংশ্লিষ্ট স্টেকহোল্ডার শিপিং এজেন্টদের সাথে বসবো। দ্রুত একটি সিদ্ধান্তে আসতে পারবো বলে আমার বিশ্বাস।’

সর্বেশেষ ৭ ডিসেম্বর বহির্নোঙরে দুটি জাহাজের মধ্যে বড় ধরনের সংঘর্ষ হয়। আগে থেকে নোঙরে করা ‘গ্লোবাল জেনেসিস’ জাহাজটিকে ধাক্কায় দেয় ‘ওশান লাভ’ জাহাজ। এর আগে ৬ ডিসেম্বর ‘সীকন নিংবো’ জাহাজের সাথে  সংঘর্ষ হয় ‘আর্টমােড এনকাউন্টার’ জাহাজের। দুটি জাহাজেই পণ্যভর্তি ছিল। ১৯ নভেম্বর ‘এমভি ইউনা’ সাথে সংঘর্ষ হয় ‘বুসান স্টার’ জাহাজের। অক্টোবরে দুর্ঘটনা ঘটে তিনটি জাহাজের, সেপ্টেম্বর ঘটে একটি, আগস্টে ঘটে দুটি জাহাজ দুর্ঘটনা। এভাবে প্রতিমাসেই একাধিক দুর্ঘটনা ঘটে; যার সবগুলোই বিদেশি জাহাজে।

দুর্ঘটনার পর বিদেশি জাহাজের স্থানীয় শিপিং এজেন্টরা তাদের কেন্দ্রীয় অফিসকে দুর্ঘটনার বিষয় অবহিত করে। একইসাথে চট্টগ্রাম বন্দরকেও জানায়। এরপর জাহাজটির ক্ষতি নিরুপনে নিয়োগ হয় পিঅ্যান্ডআই ক্লাব। প্রতি দুর্ঘটনার বিপরিতে একটি করে পিএন্ডআই ক্লাব নিয়োগ করায় বন্দরের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হচ্ছে বিশ্বের শিপিং বানিজ্যে। দুর্ঘটনার বাড়ায় বহির্নোঙরে কতটা নিরাপদ তা নিয়ে প্রশ্ন তুলবে বিদেশি শিপিং কম্পানিগুলো। তারা চট্টগ্রাম বন্দরমুখি জাহাজ ভাড়া দিতে বাড়তি সতর্কতা নিবে আবার অনীহাও দেখাতে পারে।

বন্দরের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে ন্যাশনাল মেরিটাইম ইনস্টিটিউটের অধ্যক্ষ ক্যাপ্টেন ফয়সাল আজিম বলেন, ‘পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের সমুদ্রবন্দরের বহির্নোঙরে নির্ধারিত অ্যাংকরেজে জাহাজ নোঙরের নিয়ম চালু আছে। গত বছর একটি জাহাজের দুর্ঘটনার তদন্ত করতে গিয়ে আমি এ ধরনের পদ্ধতি চালুর যৌক্তিকতা অনুভব করে মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব করেছিলাম। নতুন উদ্যোগের ফলে অবশ্যই বহির্নোঙরে শৃঙ্খলা ফিরবে। বিভিন্ন দেশে ট্রানজিট দেওয়ার ফলে চট্টগ্রাম বন্দরে জাহাজের বাড়তি চাপ বাড়বে তাতে এই পদ্ধতি বেশ সুফল দিবে।

দুর্ঘটনার কারণ খুঁজতে গিয়ে দেখা গেছে, পণ্যবাহি বড় জাহাজগুলো কুতুবদিয়া গভীর সাগরে রেখে ছোট জাহাজে পণ্য স্থানান্তর করতে খরচ বেশি। খরচ কমাতে পতেঙ্গা সৈকত বরাবর আলফা নোঙর এলাকায় জাহাজ এনে পণ্য খালাস করতে চান বেশি আগ্রহী আমদানিকারকরা। কিন্তু অপেক্ষাকৃত কম গভীর এলাকায় বেশি গভীরতার জাহাজ এনে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব না হওয়ায় এসব দুর্ঘটনা ঘটছে। বেশির ভাগ দুর্ঘটনায় একটি জাহাজের সঙ্গে আরেকটির সংঘর্ষ হচ্ছে। এ বিষয়টি দেখার দায়িত্ব বন্দর কর্তৃপক্ষের। কিন্তু বহির্নোঙরে দুর্ঘটনারোধে পদক্ষেপ শক্তভাবে কার্যকর করতে পারেনি বন্দর। কিছু শিপিং এজেন্ট যারা পিঅ্যান্ডআই ক্লাবের সাথে জড়িত তারাই মুলত এর বিরোধিতা করছে। তারা আবার এজেন্ট এসোসিয়েশনের পরিচালক। এজন্য শিপিং এজেন্ট এসোসিয়েশন এবিষয়ে চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানাতে পারেনি।

বিরোধিতার কারণ জানতে চাইলে এসোসিয়েশন সভাপতি আহসানুল হক চৌধুরী বলছেন, অ্যাসোসিয়েশন এখনো কোন সিদ্ধান্ত নেয়নি কিন্তু আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি বন্দর জলসীমায় শৃঙ্খলা আনতে এটি কার্যকর করা উচিত। কারণ দুর্ঘটনা ঘটলে জাহাজের ক্ষতি হয়, জাহাজ মেরামতে আর্থিক ক্ষতি মেটাতে হয়। দুর্ঘটনা কমিয়ে না আনলে শিপিং সেক্টরে বন্দরের সুনাম ক্ষুন্ন হবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here