পিসিটি পরিচালনার কাজ পেতে বিদেশি দুই পোশাক ক্রেতাকে দিয়ে মায়ের্কস লাইনের তদবির

Dhaka Post Desk

বিশেষ প্রতিনিধি

8 August, 2022

Views

মায়ের্কস লাইনকে পতেঙ্গা কন্টেইনার টার্মিনাল (পিসিটি) পরিচালনার কাজ দিতে তদবিরে নেমেছে সুইডেনভিত্তিক পোশাক ক্রেতা ‘এইচএন্ডএম’ এবং স্পেনভিত্তিক পোশাক ক্রেতা ‘ইনডিটেক্স’ । নিয়মের ব্যতয় ঘটিয়ে এই দুটি বিদেশি ক্রেতা প্রতিষ্ঠান নৌ পরিবহন মন্ত্রনালয়ে সরাসরি চিঠি লিখে টার্মিনাল পরিচালনার কাজ দিতে তদবির করেছে; যা নজিরবিহীন।
চিঠিতে দুটি প্রতিষ্ঠান লিখেছে, মায়ের্কস লাইন বা এপি মুলার-মায়ের্কস কম্পানিকে টার্মিনাল পরিচালনার কাজ দিতে এনভায়রনমেন্টাল, সোশ্যাল ও গভর্নেস বিষয়গুলো বিবেচনায় রাখার গুরুত্ব দেয়া উচিত। মায়ের্কসকে কাজ দিলে বাংলাদেশ থেকে রপ্তানি পণ্য পরিবহন নিরবচ্ছিন্ন থাকার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে চিঠিতে।

কিন্তু মায়ের্কস লাইনের মতো প্রতিষ্ঠানকে একটি টার্মিনাল পুরোপুরি পরিচালনার কাজ দেয়া হলে বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ টার্মিনাল একটি প্রতিষ্ঠানের হাতে জিম্মি হয়ে পড়ার শঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা। তাদের যুক্তি, এরমধ্য দিয়ে বাংলাদেশে কর্মরত অন্য বিদেশি শিপিং লাইনগুলো বৈষম্যের শিকার হবে। একইসাথে বাংলাদেশ থেকে পোশাক কেনা অন্য বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোও অসম প্রতিযোগিতার মধ্যে পড়বে। এরফলে একটি নতুন অস্থিরতা তৈরী হবে।

উল্লেখ্য, বাংলাদেশ থেকে মায়ের্কস লাইন সবচে বেশি পণ্য পরিবহন করে থাকে। ইতোমধ্যে মায়ের্কস লাইন চট্টগ্রামে ইস্পাহানি-সামিট গ্রুপের সাথে মিলে একটি বেসরকারী কন্টেইনার ডিপো করছে। একইসাথে এই প্রতিষ্ঠানটি ফ্রেইট ফরোয়ার্ডার ব্যবসার সাথেও সংশ্লিষ্ট। তাদের আছে কন্টেইনার পরিচালনা ব্যবসা। ফলে পিসিটির মতো গুরত্বপূর্ণ টার্মিনাল এককভাবে তাদের পরিচালনার কাজ দেয়া মানো জিম্মি হয়ে যাওয়া বলছেন শিপিং সংশ্লিষ্টরা।

বিদেশি শিপিং লাইনের শীর্ষ এক কর্মকর্তা বলছেন, মায়ের্কস লাইনকে কাজ দেয়ার জন্য যদি শিষ্টাচার না মেনে এইচএন্ডএম, ইনডিটেক্স তদবির করে। তাহলে এমএসসিকে টার্মিনাল অপারেটর কাজ দেয়ার জন্য বাংলাদেশের সবচে বড় পোশাক ক্রেতা ‘ওয়ালমার্ট’ তদবির করার সুযোগ পাবে। আর ওরিয়েন্ট এক্সপ্রেস লাইনকে কাজ দেয়ার জন্য তদবির করবে আরেক বড় ক্রেতা ‘প্রাইমার্ক’। এভাবে তো চলতে পারে না।
তিনি বলেন, আমাদের হাতে যদি অনেক টার্মিনাল, অনেক জেটি থাকতো তাহলে একটি তাদের দেয়া যেতো। এখন টার্মিনাল তো কেবল একটি। সেটিই তাদের দিবে কিভাবে। আর তারা এভাবে শিষ্টাচার না মেনে তদবির করে কিভাবে?
তিনি প্রশ্ন রাখেন, এইচএন্ডএম যে তদবির করলো তাদের সব পণ্য কী মায়ের্কস লাইনের মাধ্যমে পরিবহন হয়। আর ইনডিটেক্সের পণ্য তো এমএসসি, সিএমএ-সিজিএম, হ্যাপাগ-লয়েডস লাইন দিয়ে যায়। আর সব পণ্যই তো পতেঙ্গা টার্মিনাল দিয়ে যাবে না। তাহলে কেন এই দালালি?

উল্লেখ্য, পতেঙ্গা কন্টেইনার টার্মিনাল (পিসিটি) পরিচালনার কাজ পেতে গত জানুয়ারি মাসে প্রতিযোগিতায় যোগ দিয়েছে ড্যানিশ কম্পানি ‘মায়ের্কস লাইন’। এতদিন এই প্রতিযোগিতায় অনেক প্রতিষ্ঠান থাকলেও এগিয়ে ছিল সৌদি আরবের ‘রেড সী গেটওয়ে টার্মিনাল’ এবং দুবাইয়ের ‘ডিপি ওয়ার্ল্ড’। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এই দুটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কাকে চুড়ান্তভাবে নিয়োগ দিবে সেটি নির্বাচনে যাচাই-বাছাই করছিল। সেই সময়ে নতুন করে প্রতিযোগিতায় যোগ দিল মায়ের্কস লাইন। এর আগে অবশ্য ভারতের আদানি পোর্ট এবং সিঙ্গাপুরের পিএসএ প্রস্তাব দিয়েছিল কিন্তু সেগুলো আর এগোয়নি।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মার্চ মাসে দুবাই সফরের সময় আরব-আমিরাতভিত্তিক ‘ডিপি ওয়ার্ল্ড’ পিসিটি পরিচালনার কাজ পাচ্ছে এমন প্রচার হয়ে গিয়েছিল যদিও এখন র্পন্ত তার সত্যতা মিলেনি। তখন মায়ের্কস লাইন প্রতিযোগিতার হালে পানি পায়নি। পরে নতুন কৌশলে বিদেশি পোশাক ক্রেতাদের দিয়ে তদবির শুরু করে মায়ের্কস লাইন। মুলত বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে চাপ প্রয়োগ করেই কাজটি আদায়ের চেষ্টা করছে মায়ের্কস লাইন। এক্ষেত্রে তারা বিদেশি দুতাবাস দিয়ে চাপ প্রয়োগ করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
তাদের এই ধরনের অনৈতিক তদবির নৌ পরিবহন মন্ত্রনালয় ভালো চোখে দেখেনি। এতে মন্ত্রনালয় ক্ষুদ্ধ। জানতে চাইলে নৌ মন্ত্রনালয়ের এক কর্মকর্তা বলছেন, এরকম বিদেশি পোশাক ক্রেতার কথায় যদি টার্মিনাল অপারেটর নিয়োগ করতে হয় তাহলে একেক ক্রেতাকে একেকটি জেটি দিয়ে দিতে হবে। পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশীপের আওতায় পিসিটি পরিচালনার কাজ দেয়া হবে। আমরা চাই আইনের মধ্যে থেকে ভালো-অভিজ্ঞ-দক্ষ প্রতিষ্ঠানকে পিসিটি পরিচালনার জন্য আনা। এখন পর্যন্ত সেভাবেই আমরা এগুচ্ছি।

জানা গেছে, চট্টগ্রাম বন্দরের মূল জেটি থেকে ভাটির দিকে ড্রাই ডক এবং বোটক্লাবের মধ্যবর্তী প্রায় ২৬ একর জায়গায় কর্ণফুলী নদীর তীরে নির্মাণ করা হচ্ছে এ পতেঙ্গা কন্টেইনার টার্মিনাল। কয়েকদফা সময় পেছানোর পর ২০২২ সালের জুলাইয়ে চালুর লক্ষমাত্রা ঠিক করা হয়েছে। এই টার্মিনাল বিদেশি স্বনামধন্য অপারেটর দিয়ে পরিচালনার সিদ্ধান্ত আছে সরকারের; সেই সাথে যন্ত্রপাতিও সেই অপারেটর কিনে পরিচালনা করবে। কিন্তু মে মাস পর্যন্ত এখনো অপারেটর বা পরিচালনাকারী নিয়োগ করতে পারেনি সরকার। অথচ এখনই অপারেটর নিয়ােগের সিদ্ধান্ত নিলেও যন্ত্রপাতিসহ অপারেটর দিয়ে পরিচালনা করতে আট থেকে দশ মাস সময় লেগে যাবে।

উল্লেখ্য, টার্মিনালটি পুরোপুরি প্রস্তুত হয়ে গেলে এবং যন্ত্রপাতি যুক্ত হলে একসঙ্গে তিনটি জাহাজ থেকে কনটেইনার ওঠানো-নামানোর সুবিধা থাকবে। এতে বছরে সাড়ে চার লাখ একক কনটেইনার হ্যান্ডলিং করা যাবে। এছাড়া তেলবাহী জাহাজ ভেড়ানোর সুবিধাও থাকবে। সাড়ে নয় মিটার ড্রাফটের এবং ১৯০ মিটার দীর্ঘ পণ্যবাহি জাহাজ ভেড়ানো যাবে এই টার্মিনালে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.