পাঁচ লাইটার জেটি প্রস্তুত; সেপ্টেম্বরে পণ্য উঠানামা শুরু করছে শিল্পগ্রুপ

সময় সাশ্রয়, খরচ কমবে;

0
918

নিজস্ব প্রতিবেদক
কর্ণফুলী নদী তীরে সদরঘাটে নির্মিত পাঁচটি লাইটার বা ছোট জেটি পরিচালনার দায়িত্ব অবশেষে দেয়া হচ্ছে দেশের শীর্ষ পাঁচ শিল্পগ্রুপকে। ২০১৩ সালে নির্মিত হলেও নাব্যতা সংকটের কারণে সেগুলোতে জাহাজ ভিড়িয়ে পণ্য উঠানামার কাজ শুরু করা যাচ্ছিল না; গত ছয়মাস ধরে দেশিয় পদ্ধতিতে নদী খনন করে নাব্যতা ফিরিয়ে আনার পর জেটিগুলো জাহাজ ভিড়ানোর উপযোগি হয়েছে। এখন জেটি থেকে পণ্যবাহি ট্রাক-লরি বের হয়ার পথ তৈরী করেই আগামী সেপ্টেম্বর মাস জেটিগুলো চালু করা যাবে বলে মনে করছে বন্দর কর্তৃপক্ষ।
বন্দরের ইতিহাসে শিল্প গ্রুপকে এই ধরনের ছোট জেটি পরিচালনার দায়িত্ব দেয়ার উদ্যোগ প্রথম। এটি পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশীপেরও (পিপিপি) বড় উদাহরন।
উল্লেখ্য, বিদেশ থেকে আসা পণ্য বহির্নোঙরে বড় জাহাজ থেকে ছোট জাহাজে নামানোর পর; সেই পণ্য ছোট বা লাইটার জাহাজে এনে উক্ত পাঁচটি জেটিতে খালাস করা হবে। বর্তমানে এসব পণ্য চট্টগ্রাম বন্দর জেটিতে এবং বাকি পণ্য কর্ণফুলী নদীর বিভিন্নঘাটে খালাস করা হয়। কিন্তু সনাতনী পদ্ধতির ঘাটগুলোর চরম দুরবস্থার কারণে পণ্য খালাসে বিপুল সময় লাগে।

ব্যবহারকারীরা বলছেন, বিদেশ থেকে নিজেদের জাহাজে পণ্য এনে নিজেদের জেটিতে খালাস করার সুযোগ পাওয়ায় শিল্পগ্রুপগুলোর পণ্য পরিবহন খরচ অনেক কমবে। পণ্যবাহি জাহাজকে বহির্নোঙরে বাড়তি সময় বসে থাকতে হবে না; কম সময়ে বেশি পণ্য খালাস করতে পারবে।
জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার এডমিরাল এস এম আবুল কালাম আজাদ বলেন, শিল্পগ্রুপকে জেটি বরাদ্দ দেয়া ব্যবসাবান্ধব চট্টগ্রাম বন্দরের বড় উদাহরন। বড় শিল্পগ্রুপ গুলোর পণ্য আমদানির পরিমান অনেক বেশি; দরপত্রের মাধ্যমে জেটি বরাদ্দ দেয়ায় সেই বিপুল পণ্য উঠানামার চাপ বন্দরের ওপর আসবে না। তারাও দ্রুত পণ্য খালাস করতে পারবে।
তিনি বলেন, এই পাঁচটি জেটি ছাড়াও কর্ণফুলী নদী তীরে পর্যায়ক্রমে ১৫টি লাইটার জেটি নির্মান করছি। এরমধ্যে লালদিয়ায় ইনকনট্রেড ডিপোর পাশে পাঁচটি লাইটার জেটির নির্মানকাজ চলছে। চান্দগাঁও হামিদচরে পাঁচটি, সীতাকুন্ড এলাকায় পাঁচটি।

বন্দর কর্তৃপক্ষ পাঁচটি লাইটার জেটিতে নির্দিষ্ট আমদানিপণ্য খালাসের জন্য নির্দিষ্ট শিল্পগ্রপকে বরাদ্দ দিয়েছে। মধ্যে এক নম্বর জেটিতে এক নম্বর জেটিতে খালাস হবে খাদ্যশস্য; সেটি পরিচালনা করবে বিএসএম গ্রুপ। দুই নম্বর জেটিতে বিএসআরএম গ্রুপ, তিন নম্বর জেটিতে কেএসআরএম গ্রুপ, চার নম্বর জেটিতে একেএস গ্রুপ। ২, ৩, ৪ নম্বর জেটি বরাদ্দ রাখা হয়েছে লৌহ ও ইস্পাত শিল্পের জন্য এবং পাঁচ নম্বর জেটি সিমেন্ট শিল্পের কাঁচামাল খালাসের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে; সেটি পরিচালনা করবে কনফিডেন্স সিমেন্ট।
জানা গেছে, প্রতিটি জেটি ব্যবহারের জন্য বছরে তিন থেকে পাঁচ কোটি টাকা পাবে বন্দর কর্র্তৃপক্ষ। প্রত্যেক শিল্পগ্রুপ ১০ বছরের জন্য জেটি বরাদ্দ পাবেন, প্রতিবছর উক্ত টাকা জমা দিয়ে তারা কার্যক্রম চালাবে।

জানতে চাইলে বিএসএম গ্রুপের চেয়ারম্যান আবুল বশর চৌধুরী শিপিং এক্সপ্রেসকে বলেন, লাইটার জেটি ব্যবহারে অনেক ধরনের সুবিধা মিলবে। বহির্নোঙরে পণ্যবাহি জাহাজকে বাড়তি সময় বসে থাকতে হবে না, পণ্য সরবরাহের সাপ্লাই-চেইন ঠিক থাকবে, আমদানি পণ্য নষ্ট হবে না, দ্রুত খালাসও নিশ্চিত হবে। নতুন জেটিতে দ্রুত পণ্য নামাতে আমরা আধুনিক সব যন্ত্রপাতি যোগ করবো।
তিন নম্বর জেটিতে লৌহ ও ইস্পাত শিল্প খালাস করবে কেএসআরএম গ্রপ। গ্রুপের মহাব্যবস্থাপক (চার্টারিং) ক্যাপ্টেন দিদারুল আলম শিপিং এক্সপ্রেসকে বলেন, আমরা শুনেছি কিন্তু জেটি চালুর অফিসিয়াল চিঠি পাইনি। আমাদের নিজেদের ১৮টি মাদার ভ্যাসেল বা বড় জাহাজ আছে; যেগুলো বিশ্বের বিভিন্ন বন্দর থেকে পণ্য নিয়ে আসছে। আবার নিজেদের লাইটার জাহাজও আছে। ফলে জেটিতে পণ্য খালাসে আমাদের খরচ অনেক সাশ্রয় হবে। আর সঠিক সময়ে পণ্য আসা নিশ্চিত হওয়ায় আমাদের কারখানায় নিরবচ্ছিন্ন উৎপাদন অব্যাহত রাখতে পারবো।

জানা গেছে, কর্ণফুলী নদীর সদরঘাটে ২০১৩ সাল থেকে এসব লাইটার জেটি নির্মিত হয়। কিন্তু নাব্যতা সংকটের কারণে সেগুলো সচল করা যায়নি। কর্ণফুলী নদীর ক্যাপিটাল ড্রেজিং প্রকল্পের ঠিকাদার মাঝপথে কাজ ফেলে পালিয়ে যাওয়ায় লাইটার জেটি চালু অনিশ্চয়তায় পড়ে। এরপর বন্দর কর্তৃপক্ষ নতুন প্রকল্প নিয়ে নাব্যতা ফেরানোর কাজ শুরু হলে পলিথিনের কারণে সেই কাজেও জটিলতা তৈরী হয়। এরইমধ্যে বন্দর কর্তৃপক্ষ শিল্পগ্রুপকে এসব জেটি বরাদ্দের দরপত্র ডাকলে বহির্নোঙরে কর্মরত শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটররা উচ্চ আদালতে রীট করে বসে। এতে পুরো প্রক্রিয়া হোঁচট খায় এবং জেটি চালুর উদ্যোগও থমকে যায়।  এরপর বন্দর কর্তৃপক্ষ উচ্চ আদালতে লড়াই করে রায় নিজেদের পক্ষে এনে জেটি সচলের কাজ শুরু করে।
কর্ণফুলী নদীর নাব্যতা ফেরানো প্রকল্পের পরিচালক ও বন্দরের চীফ হাইড্রোগ্রাফার কমান্ডার আরিফুর রহমান শিপিং এক্সপ্রেসকে বলেন, ‘স্থানীয় প্রযুক্তি ব্যবহার করেই আমরা এই পাঁচ জেটিতে চার মিটারের বেশি নাব্যতা আনতে সক্ষম হয়েছি। এই প্রযুক্তি দিয়েই আমরা পরবর্তীতে নাব্যতা সচলের কাজ চালাবো। ইতোমধ্যে লাইটার জাহাজ পরীক্ষামূলকভাবে ভিড়িয়ে সফল হয়েছি। এখন জেটিতে ফেন্ডারিং লাগানোর কাজ চলছে। জেটিতে ট্রাকপ্রবেশ পথ ঠিক করা হচেছ। আশা করছি আগামী সেপ্টেম্বর মাস থেকেই জেটি ব্যবহার করতে পারবেন।’

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here