জাহাজে আটকা ১২শ কোটি টাকার রপ্তানি পণ্য

৪৮ ঘন্টায় বন্দর ছাড়তে পারেনি ‘ওইএল হিন্দ’

0
1098
নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম
চট্টগ্রাম বন্দর জেটিতে কাত হয়ে যাওয়া ‘ওইএল হিন্দ’ বিদেশি জাহাজে থাকা ১২শ কোটি টাকার রপ্তানি পণ্য নিয়ে চরম উদ্বেগে পড়েছেন বাংলাদেশি পণ্য উৎপাদনকারীরা। আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় পড়ে ৪৮ ঘন্টা পরও জাহাজটি বন্দর ছেড়ে যাওয়ার অনুমতি পায়নি।এই অবস্থায় সিঙ্গাপুর বন্দর হয়ে বড় জাহাজ বা মাদার ভ্যাসেলে তুলে পণ্যগুলো ইউরোপ-আমেরিকায় যথাসময়ে পৌঁছানো নিয়ে উদ্বেগে পড়েছেন; কারণ নির্দিশ্ট সময়ে বিদেশি ক্রেতার কাছে পৌঁছাতে না পারলে ওই পণ্য গ্রহন না করা বা বাতিলের ঝুঁকি থাকে।‘ওইএল হিন্দ’ জাহাজটি ১২শ ৬৮ একক কন্টেইনার নিয়ে গত রবিবার সকালে চট্টগ্রাম বন্দর ছেড়ে যাওয়ার শিডিউল ছিল। জাহাজটি অন্তত ২শ রপ্তানিকারকের এক হাজার কোটি টাকার বেশি রপ্তানি পণ্য রয়েছে; যেগুলোর বেশিরভাগই যাবে ইউরোপ এবং আমেরিকায় ক্রেতার কাছে। কিন্তু চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্য উঠানামার কাজে নিয়োজিত বার্থ অপারেটর ‘বে প্ল্যান’ অনুযায়ী কন্টেইনার সঠিকভাবে না রাখায় জাহাজটি ভারসাম্যহীন হয়ে পড়ে। এরপর রবিবার সকালে জাহাজটির যাত্রা স্থগিত করা হয়। গত রবিবার রাত ১১টা থেকে রাতভর কাজ করে জাহাজের বিভিন্ন স্তর থেকে ৬৬ পণ্যভর্তি কন্টেইনার নামিয়ে জাহাজটি ভারসাম্য আনা হয়। রাতভর নিরলস চেষ্টার উদ্দেশ্য ছিল গত সোমবার দুপুরের জোয়ারে জাহাজটি চট্টগ্রাম বন্দর ত্যাগ করা। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে সোমবার সেটি ছেড়ে যাওয়া বাতিল করা হয়। বন্দর কর্তৃপক্ষ থেকে বলা হয় নৌ বাণিজ্য অধিদপ্তর জরিপ করে ক্রুটিমুক্ত সনদ দিলে জাহাজটি মঙ্গলবার বন্দর ছেড়ে যেতে পারবে। কিন্তু সোমবার সারাদিন জাহাজটি জেটিতে বসে থাকলেও কোন টীম জাহাজ পরিদর্শনে যায়নি। গার্মেন্ট মালিকদের পক্ষ থেকে উদ্বেগ জানিয়ে  চট্টগ্রাম বন্দর চেয়ারম্যান এবং বন্দরের ট্রাফিক, মেরিন বিভাগকে বিষয়িট জানিয়ে দ্রুত জাহাজ ছেড়ে দেয়ার প;ক্ষেপ নেয়ার আহবান জানানো হয়। বন্দর চেয়ারম্যান সেই আশ্বাস দিয়েছিলেন। কিন্তু মঙ্গলবারও জাহাজ ছাড়ার অনুমতি মিলেনি।

জানা গেছে, সরকারের নৌ বাণিজ্য অধিদপ্তরের সার্ভেয়ার ক্যাপ্টেন জালাল উদ্দিন গাজী মঙ্গলবার অন্তত ৬ ঘন্টা ‘ওইএল হিন্দ’ জাহাজটি পরিদর্শন করে কোন কারিগরি ত্রুটি খুঁজে পাননি। জাহাজটি সমুদ্র যাত্রার ক্ষেত্রে কোন ত্রুটি মিলেনি। কিন্তু জাহাজে থাকা কন্টেইনারের ভিজিএম বা ভেরিফায়েড গ্রস ম্যাস জমা দেয়ার জন্য নির্দেশনা দেয়া হয়। নিয়মানুযায়ী জাহাজের ক্যাপ্টেন পণ্যের ভিজিএম দেন না। কন্টেইনার ডিপো কর্তৃপক্ষ কন্টেইনারসহ পণ্যের ওজন দেন জাহাজের মেইন লাইন অপারেটরকে, জাহাজের মেইন লাইন অপারটেররা বন্দরের ভ্যাসেল ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমে জমা দেন। ফলে জাহাজের ক্যাপ্টেন কিভাবে ভিজি্এম দিবেন তা নিয়ে প্রশ্ন উঠে। শুধু তাই নয়; জাহাজটির ভারসাম্য নিশ্চিত হওয়ার পর ভিজিএম কেন প্রয়োজন হবে তা নিয়েও বিতর্ক দেখা দেয়।
জানতে চাইলে নৌ বাণিজ্য অধিদপ্তরের সার্ভেয়ার ক্যাপ্টেন জালাল উদ্দিন গাজীকে ফোন করা হলে তিনি সার্ভে করার বিষয়টি স্বীকার করলেও  রিপোর্ট নিয়ে গনমাধ্যমে কোন মন্তব্য করতে পারবেন না বলে জানান।

আর জাহাজটির শিপিং এজেন্ট , এটা দেশের রপ্তানির জন্য বড় ধরনের ক্ষতি হয়ে গেল। এই জাহাজ তিনদিন দেরি করায় সিঙ্গাপুরে মাদার ভ্যাসেল ধরতে পারবে না। কারণ তিনদিনে আমরা জাহাজ ভাড়া দিতে হবে ২৭ হাজার মার্কিন ডলার, বন্দর জেটিতে তিনদিন বাড়তি থাকার ভাড়া যোগ হয়ে বিপুল আর্থিক ক্ষতি হবে। সেটার চেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে কভিড মহামারির সময়ে এই ঘটনায় খুবই উদ্বিগ্ন রপ্তানিকারকরা।
তিনি বলছেন, মঙ্গলবার অন্তত ছয় ঘন্টা জাহাজটি পরিদর্শন করেছেন নৌ বাণিজ্য অধিদপ্তরের সার্ভেয়ার কিন্তু তারা জাহাজটি সাগরপথে চলাচলে কোন কারিগরি ত্রুটি পায়নি। এরপর ভিজিএম (পণ্যসহ কন্টেইনারের ওজন) বলা হলো কিন্তু জাহাজ ক্যাপ্টেনের কাছে তো কন্টেইনারের নিজস্ব কোন ভিজিএম নেই; কন্টেইনার ডিপো থেকে ভিটিএমআইএস হয়ে আমাদের কাছে আসে। ফলে সেটি আমরা কোত্থেকে দিবো। এখন পর্যন্ত যত জাহাজ ছেড়ে যাচ্ছে তাদের ক্যাপ্টেন তো কোন ভিজিএম দেয় না।

জানতে চাইলে গার্মেন্ট মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ পরিচালক অঞ্জন শেখর দাশ বলেন, ‘আমরা চট্টগ্রাম বন্দরকে অনুরোধ করে বলেছি সার্ভে রিপোর্ট দ্রুত সংগ্রহ করে কোন ধরনের সময়ক্ষেপন না করে জাহাজটি যাতে বন্দর ছাড়তে পারে। জাহাজটি সোমবার চাড়তে পারেনি, এমনকি মঙ্গলবারও জেটি ছাড়তে পারেনি। এই জাহাজের পণ্য সিঙ্গাপুরে গিয়ে বড় জাহাজ বা মাদার ভ্যাসেলের সাথে কানেক্ট করতে হবে। তা না হলে বিদেশি ক্রেতার কাছে পৌঁছানো বিলম্বিত হলে আমরা অর্ডার হারানোর ঝুঁকিতে পড়বো।’ তিনি বলছেন, রবিবার সকালে প্রথমদিকে যে কটি রপ্তানি কন্টেইনার জাহাজ থেকে নামানো হয়েছিল সেগুলো রবিবারই আরেক জাহাজে করে জাহাজীকরণ হয়ে গেছে। কিন্তু আমাদের সব কন্টেইনার দুদিন ধরে আটকা পড়েছে।

আর চট্টগ্রাম বন্দর সচিব ওমর ফারুক বলেন, ‘দৃশ্যত মনে হচ্ছে জাহাজটি এখন সোজা বা ভারসাম্য অবস্থায় এসেছে। কিন্তু আভ্যন্তরীন কোন কারিগরি সমস্যা আছে কিনা তা জানতে সার্ভেয়ার ও টেকনিক্যাল টীম জাহাজটি পরিদর্শন করেছে। বিষয়টি আমরা নৌ বানিজ্য দপ্তরের মহাপরিচালককে জানিয়েছি। তারা এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে ত্রুটিমুক্ত নিশ্চিত করলে বন্দর ছেড়ে যেতে পারবে। তাদের রিপোর্টের অপেক্ষায় আছি। রিপোর্ট যত দ্রুত মিলবে তত দ্রুত জাহাজ ছেড়ে যেতে পারবে।

অভিযোগ উঠেছে, আন্তরিকতা থাকলে সোমবারই জাহাজের ত্রুটিমুক্ত নিশ্চিত করে জাহাজটি বন্দর ছেড়ে যেতে পারতো। মুলত বন্দর  ও নৌ বাণিজ্য অধিদপ্তরের মধ্যে আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় পড়ে জাহাজটি নিয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত আসেনি। আর এর খেসারত দিচ্ছেন এক হাজার ২শ কোটি টাকার পণ্য রপ্তানিকারকরা।

চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহারকারীরা বলছেন, জাহাজের কন্টেইনার জাহাজীকরণ করা হয় ‘বে প্ল্যান’ অনুযায়ী। বে প্ল্যানে জাহাজের কোন স্তরে কত ওজনের বা কোন ধরনের কন্টেইনার রাখা হবে তার একটি পরিকল্পনা দেয়া হয়। শিপিং লাইনের প্লানিং বিভাগ এই পরিকল্পনা তৈরী করে; জাহাজের ক্যাপ্টেনের মাধ্যমে বার্থ অপারেটরকে জমা দেন। কারণ পণ্য উঠানামার কাজটি বন্দরের হয়ে করে থাকে বার্থ অপারেটররা।
নিয়ম অনুযায়ী, সবচে বেশি ওজন বা ১৮ টন ওজনের কন্টেইনার রাখা হয় জাহাজের একেবারে নীচের স্তরে। এরপর ধারাবাহিকভাবে কম ওজনের কন্টেইনার রাখা হয় ক্রমান্বয়ে ওপরে। এরফলে ওজনে অনুযায়ী কন্টেইনার সাজিয়ে রেখে জাহাজটিকে ভারসাম্য আনা হয়।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২২ আগস্ট ‘ডিভন’ জাহাজটি এবং ২৩ আগস্ট ‘ওইএল হিন্দ’ জাহাজটি লোডিং প্ল্যান অনুযায়ী কন্টেইনার রাখা হয়নি। জাহাজের নীচের স্তরে খালি কন্টেইনার ও কম ওজনের কন্টেইনার দিয়ে সাজানো হয়েছে। শেষদিকে এসে কিছু রপ্তানি কন্টেইনার জেটিতে চলে আসায় সেগুলো জাহাজের ওপরের দিকে তুলে দেয়া হয়েছে। এরফলে জাহাজের ভারসাম্য রক্ষা হয়নি বলেই এককাত হয়ে জেটির সাথে লেগে গেছে। জেটিতে না লাগলে জাহাজ থেকেই ওপরের দিকের কন্টেইনারগুলো জেটিতে ধ্বসে পড়তো অথবা রপ্তানি পণ্যভর্তি কন্টেইনারগুলো নদীতে পড়ে যেতে পারতো। এতে বিপুল ক্ষতি হতো এসব রপ্তানি পণ্যের।
লোডিং প্ল্যান না মানার কারণ হিসেবে বন্দর ব্যবহারকারীরা বলছেন, বার্থ অপারেটরদের মধ্যে হুড়োহুড়ি করে কাজ শেষ করার প্রতিযোগিতা থাকে। কারণ বেশি জাহাজ পণ্য উঠানামা সম্পন্ন করতে পারলে বেশি লাভ। এই প্রবনতা থেকেই তারা সঠিকভাবে নিয়ম মানেন না। ফলে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here