চীন-আমেরিকা রুটে একটি কন্টেইনার পরিবহন ভাড়া ২০ হাজার ডলার ছাড়ালো !

বিশেষ প্রতিনিধি
চীন থেকে আমেরিকা জাহাজে একটি ৪০ ফুট দীর্ঘ পণ্যবাহি কন্টেইনারের পরিবহন খরচ ২০ হাজার মার্কিন ডলার ছাড়িয়েছে; যা অবিশ্বাস্য বটে। কিন্তু সেটিই সত্যি প্রমানিত হয়েছে। স্বাভাবিক সময়ে এই ভাড়া ছিল ১০ হাজার মার্কিন ডলারের নীচে কিন্তু জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহে সেই ভাড়া ২০ হাজার ৮০৪ ডলারে পৌঁছেছে। এ হার গত বছরের তুলনায় ৫০০ শতাংশ বেশি। গত ২৭ জুলাই এ হার মাত্র ১১ হাজার ডলারেরও কম ছিল। চীন থেকে যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিম উপকূলে কনটেইনার পরিবহন ব্যয়ও ২০ হাজার ডলারের কাছাকাছি পৌঁছেছে। এছাড়া চীন-ইউরোপে এ ব্যয় প্রায় ১৪ হাজার ডলার।

চট্টগ্রাম বন্দরে এর নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে শঙ্কা তৈরী হয়েছে ব্যবসায়ীদের মধ্যে। তাদের মতে, আমেরিকায় যেতে পণ্য পরিবহন খরচ বাড়লে স্বাভাবিকভাবেই এর প্রভাব বাংলাদেশমুখি পণ্য পরিবহনে পড়বে কোন সন্দেহ নেই। তবে কতটা প্রকট আকার ধারন করে সেটিই দেখার বিষয়।

বন্দর ব্যবহারকারীরা বলছেন, চীনের কিছু প্রদেশে কভিডের ডেল্টা সংক্রমন ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়া এবং জুলাইয়ের শেষ দিকে চীনের ব্যস্ততম দক্ষিণ উপকূলে টাইফুনে বন্যার কারণে পণ্য পরিবহনে বিপর্যয় সৃষ্টি হয়। এর প্রভাবেই পণ্যবাহি কন্টেইনার পরিবহন খরচ বেড়ে যায়।

রয়টার্সের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের কেনাকাটার মৌসুমের আগে খুচরা বিক্রেতাদের ক্রমবর্ধমান ক্রয়াদেশের কারণে এমনিতেই বৈশ্বিক সরবরাহ চেইনে চাপ সৃষ্টি হয়েছিল। এখন আবার যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে সংক্রমণ বাড়ার কারণে কনটেইনারের প্রত্যাবর্তন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। আর এ সংকটগুলো কনটেইনার পরিবহন ব্যয়কে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে।

কভিড-১৯ মহামারীর বিধ্বস্ত অবস্থা থেকে ঘুরে দাঁড়াচ্ছিল বিশ্ব অর্থনীতি। রেকর্ড প্রবৃদ্ধির দেখা পাওয়া যায় অর্থনীতির বিভিন্ন সূচকে। বিস্তৃত টিকাদান কার্যক্রমের মাধ্যমে মহামারী নিয়ন্ত্রণের আশাও দেখা দিয়েছিল। তবে কভিডের ডেল্টা ধরন যেন সবকিছুকে পাল্টে দিচ্ছে। ডেল্টার সংক্রমণ এবং গত মাসের শেষ দিকে চীনে বন্যা বিশ্বজুড়ে কনটেইনার পরিবহনকে ধীর করে দিয়েছে। এ সংকটের পর চীন থেকে যুক্তরাষ্ট্রে ৪০ ফুটের একটি কনটেইনার পরিবহন ব্যয় ২০ হাজার ডলার ছাড়িয়েছে। এ হার গত বছরের তুলনায় ৫০০ শতাংশ বেশি।

সামুদ্রিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ড্রিউরির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফিলিপ দামাস বলেন, এ কারণগুলো বিশ্বজুড়ে কনটেইনার পরিবহনকে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। যুক্তরাষ্ট্রকে স্বল্প সরবরাহের বাজারে পরিণত করেছে। এ কারণে শিপিং সংস্থাগুলো পণ্য পরিবহনের ব্যয় স্বাভাবিকের চেয়ে চার থেকে দশগুণ বাড়িয়ে তুলেছে।
তিনি বলেন, গত ৩০ বছরেরও বেশি সময় ধরে পণ্য পরিবহনে এমন পরিস্থিতি আমরা দেখিনি। এ অতি উচ্চ ব্যয় ২০২২ সালের চীনা নববর্ষ পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে বলেও আশঙ্কা করেন তিনি।

চীনের বন্দর সমিতির সভাপতি ডিং লি রয়টার্সকে বলেন, বিভিন্ন দেশে পুনরায় কভিডের সংক্রমণ এ ব্যয় বাড়তে অবদান রেখেছে। সংক্রমণ বাড়ার কারণে কিছু বিদেশী বন্দরে সাত-আটদিন পর্যন্ত অতিরিক্ত সময় ব্যয় হচ্ছে। ক্রমবর্ধমান কনটেইনার পরিবহন ব্যয় জাহাজের জন্য ব্যয়কেও বাড়িয়ে তুলতে উৎসাহিত করছে। ফলে শিপিং ফার্মগুলোকে কম লাভজনক রুট বাদ দিয়ে বেশি লাভজনক রুটে পণ্য পরিবহন পরিসেবা স্থানান্তরে বাধ্য করেছে।

কন্টেইনার পরিবহন খাতের গবেষণা প্রতিষ্ঠান লাইনারলিটিকার নির্বাহী পরামর্শক তন হুয়া জু বলেন, যেসব নৌপথে পণ্য পরিবহনের ব্যয় বেশি, সেখানে কেবল জাহাজগুলো লাভজনকভাবে পরিচালিত হতে পারে। এজন্য কিছু সংস্থা ট্রান্সআটলান্টিক ও এশিয়ার মতো কম লাভজনক পথে জাহাজ কমিয়ে দিচ্ছে। এর মানে বাকি নৌপথগুলোতেও পণ্য পরিবহন ব্যয় দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *