কুতুবদিয়া-চট্টগ্রাম ‌’বে পাইলটিং’ বিরোধিতা কার স্বার্থে ?

0
1529

বিশেষ প্রতিনিধি
কুতুবদিয়া গভীর সাগর থেকে চট্টগ্রাম বন্দর বহির্নোঙর পর্যন্ত ২০ নটিক্যাল মাইল দীর্ঘ সাগরে বড় আকারের জাহাজ চালিয়ে আনার জন্য ‘বে পাইলটিং’ চালুর উদ্যোগ নিয়েছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। মুলত জাহাজ পাইলটিংয়ে এই মুহুর্তে চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা না থাকায় সীমিত সময়ের জন্য এই উদ্যোগ। কিন্তু গুটিকয়েক শিপিং এজেন্টর বিরোধিতার কারনে সেই উদ্যোগ আলোর মুখ দেখেনি।

জানা গেছে, শিপিং এজেন্ট এসোসিয়েশনের কয়েক নেতা কিন্তু প্রভাবশালী  হওয়ার কারনে ‘বে পাইলটিং’ সফলতা পায়নি। এই নেতারা এসোসিয়েশনের নামে বিবৃতি দিলে কার্যনির্বাহী কমিটির বেশিরভাগ নেতাই একমত নয়।
এসােসিয়েশনের একটি পক্ষ চায়, সাগরে জাহাজ পাইলটিংয়ে শৃঙ্খলা ফিরে আসুক, দুর্ঘটনা কমে আসুক। এতে ভালো শিপিং ব্যবসায়ীরাই লাভবান হবেন। কিন্তু এসোসিয়েশনের ছোট্ট একটি পক্ষ চাইছে, ব্যক্তিগত অবৈধ সুবিধা আদায় নিশ্চিত করতে বে পাইলটিং চালুতে নানা কৌশলে বাধা দিচ্ছে। কারণ সেটি চালু হলে এক হাজার মার্কিন ডলারের পাইলটিং মাশুল বিদেশি কম্পানির কাছ থেকে চার হাজার ডলারে আদায় করা যাবে না। আর সাগরে পণ্যবাহি জাহাজে দুর্ঘটনা ঘটলে জাহাজ উত্তোলনকারী (সেলভেজ কম্পানি) এবং ক্ষতিপুরণ নির্ধারনে নিয়োজিত ইন্সুরেন্স কম্পানিগুলোর ব্যবসা লাটে উঠবে। শিপিং এজেন্টদের অনেক নেতারই সেলভেজ ও ইন্সুরেন্স ব্যবসা আছে। ফলে তারা জেনেশুনে ব্যবসা হারাতে চান না।

বিরোধিতার কারণ জানতে চাইলে শিপিং এজেন্ট এসোসিয়েশনের সাবেক সৈয়দ মোহাম্মদ আরিফ বলছেন, পাঁচটি অনভিজ্ঞ প্রতিষ্ঠান দিয়ে এই বে পাইলটিং চালু করা হচ্ছে। আমাদের অভিযােগের পর সাবেক বন্দর চেয়ারম্যান আমাদের আশ্বাস দিয়েছেন আপাতত উদ্যোগ স্থগিতের।
এদিকে শিপিং এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশন বে পাইলটিংয়ে তালিকাভুক্ত পাঁচ প্রতিষ্ঠানকে ‘নাম সর্বস্ব ও অনভিজ্ঞ’ আখ্যায়িত করে নেভিগেশনাল ফেসিলিটেটর হিসেবে এসব প্রতিষ্ঠানের তালিকাভুক্তি বাতিল চেয়ে নৌ পরিবহন প্রতিমন্ত্রীকে ৩১ জানুয়ারি একটি চিঠি দিয়েছে।

জানা গেছে, কক্সবাজারের কুতুবদিয়া গভীর সাগর থেকে চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙর পর্যন্ত সাগরে পণ্যবাহি জাহাজ চালিয়ে আনার (বে পাইলটিং) জন্য ৫টি প্রতিষ্ঠানকে তালিকাভূক্ত করেছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। বাংলাদেশ জলসীমায় পৌঁছার পর পণ্যবাহি জাহাজ-ট্যাংকারের নিরাপদ চলাচল এবং নোঙরের জন্য ওই প্রতিষ্ঠান থেকে মাস্টার মেরিনার নিতে হবে জাহাজ পরিচালনকারী কম্পানিগুলোকে।
জলসীমা নিরাপদ এবং দুর্ঘটনামুক্ত রাখার জন্য চট্টগ্রাম বন্দরের উদ্যোগটি শুভ হলেও এর প্রক্রিয়া এবং তালিকাভূক্ত প্রতিষ্ঠানের এই কাজের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। এরপর থেকে বন্দর কর্তৃপক্ষ সেই উদ্যোগ স্থগিত করে। এখন শিপিং লাইনগুলো নিজেদের উদ্যোগে পাইলট দিয়ে এই পথ পাড়ি দিচ্ছে। আর এতেই বিপুল অবৈধ আয় করছেন কতিপয় শিপিং এজেন্ট নেতা।

কুতুবদিয়া থেকে বন্দরের বহির্নোঙর পর্যন্ত প্রতিমাসে প্রায় ৮০টি বড় আকারের (১০ মিটার গভীরতার বেশি) পণ্যবাহি জাহাজ-ট্যাংকার চলাচল করে। জাহাজে থাকা বিদেশি ক্যাপ্টেনরা এই রুট সম্পর্কে যথেষ্ট অবগত না হওয়ায় দেশিয়-অভিজ্ঞ মাস্টার মেরিনার নিয়ে এই পথ পাড়ি দেয়ার প্রয়োজন হয়।

নাফ মেরিন গ্রুপের প্রধান নির্বাহী এবং মাস্টার মেরিনার ক্যাপ্টেন সালাহউদ্দিন চৌধুরী  বলেন, বন্দরের জলসীমা দুর্ঘটনামুক্ত ও নিরাপদ রাখতে এটি ভালো উদ্যোগ কিন্তু এই কাজটি মাস্টার মেরিনারদের। তাদেরকে অর্ন্তভূক্ত না করে এমন কিছু প্রতিষ্ঠানকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে যাদের এই কাজের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন আছে। ফলে তাদের দিয়ে বন্দরের বহির্নোঙর নিরাপদ রাখা নিয়ে সংশয় আছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বে পাইলটিংয়ে চট্টগ্রাম বন্দরের তালিকাভ’ক্ত পাঁচটি কম্পানি হলো, জুনার শিপিং লাইনস; ডিএমএসসি, কেএমসি শিপিং লাইনস, আয়ার শিপিং সার্ভিস, বাংলাদেশ সি গোয়িং পাইলট সার্ভিস কম্পানি লিমিটেড। এরমধ্যে বাংলাদেশ সি গোয়িং পাইলট সার্ভিস কম্পানি লিমিটেডের মালিক দেখানো হয়েছে চট্টগ্রাম বন্দরের অবসরপ্রাপ্ত পাইলট আবু নাসেরের স্ত্রী মেহেরুন্নেসা নাসেরের নামে। আয়ার শিপিং সার্ভিসের কর্ণধার হচ্ছেন ক্যাপ্টেন ইমাম; যিনি চট্টগ্রাম বন্দরের বর্তমান এক পাইলটের ঘনিষ্ট বন্ধু। জুনার শিপিং লাইনস এর মালিক দেখানো হয়েছে শিপিং এজেন্ট এসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি পারভেজ সাজ্জাদ আকতারের  স্ত্রী শাহেদা পারভেজের নামে। আর ডিএমএসসি হচ্ছে চট্টগ্রাম বন্দরের সাবেক ডেপুটি কনজারভেটর ক্যাপ্টেন নাজমুল আলম এবং কে এম সি শিপিং লাইনসের মালিক হচ্ছেন কাপ্তাই শিপিং লাইনসের আজিম রহিম চৌধুরী।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here