কী কারণে শীর্ষ তালিকায় নয় ধাপ পেছালো চট্টগ্রাম বন্দর

বিশেষ প্রতিনিধি
কন্টেইনার উঠানামায় বিশ্বের শীর্ষ বন্দরের তালিকা থেকে এবার নয়ধাপ পিছিয়েছেে চট্টগ্রাম বন্দর। পিছিয়ে যাওয়ার মুল কারণ হচ্ছে কভিড মহামারির ধাক্কা। বিশ্বজুড়েই কভিড ধাক্কায় দেশগুলোর আমদানি-রপ্তানি কমেছে; এর নেতিবাচক প্রভাবে বন্দরগুলোতে পণ্য উঠানামা কমেছে। চট্টগ্রাম বন্দরও সেই তোপ থেকে বাঁচতে পারেনি।
২০২০ সালের পণ্য উঠানামার তথ্য দিয়েই বিশ্বের শীর্ষ ১শ বন্দরের তালিকা তৈরী করেছে শিপিং বিষয়ক বিশ্বের সবচে পুরণো সাময়িকী ‘লয়েডস লিস্ট’।  সেই তালিকায় চট্টগ্রাম বন্দরের অবস্থান ৬৭তম। এর আগের বছর চট্টগ্রাম বন্দরের অবস্থান ছিল ৫৮তম।
চট্টগ্রাম বন্দরের হিসাবে, ২০১৮ সালে ২৯ লাখ ৩ হাজার ৯৯৬ একক। ২০১৯ সালে পণ্য উঠানামা বেড়ে ৩০ লাখ ৮৮ হাজার ১৮৭ একক হয়েছে। ২০২০ সালের মার্চ মাসে কভিডের কারণে দেশে লকডাউন শুরু হলে আমদানি-রপ্তানি কমে আসে; সেই সাথে পণ্য উঠানামায়ও ধ্বস নামে। এই কারণে ২০২০ সালে চট্টগ্রাম বন্দরে কন্টেইনার উঠানামা ২ লাখ একক কমে হয়েছে ২৮ লাখ ৩৯ হাজার ৯৭৭ একক কন্টেইনার। আর সেই তথ্যের ভিত্তিতেই লয়েডস লিস্ট তালিকা প্রকাশ করেচে ২৩ আগস্ট রাতে।


শুধু পণ্য উঠানামাই নয়; কভিডের কারণে চট্টগ্রাম বন্দরে জাহাজ আসাও কমেছে। ২০১৮ সালে জাহাজ বার্থিং পেয়েছিল তিন হাজার ৭৪৭টি। ২০১৯ সালে জাহাজ এসেছিল তিন হাজার ৮০৭টি। কিন্তু কভিডের সময় ২০২০ সালে চট্টগ্রাম বন্দরে জাহাজ এসেছিল হয়েছে তিন হাজার ৭২৮টি। জাহাজ আসা কমে গিয়েছিল। ফলে তথ্যভিত্তিক চিত্র একেবারেই পরিস্কার।
জিবিক্স লজিস্টিকসের অ্যাসিস্ট্যান্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট মুনতাসির রুবাইয়াত বলেছেন, কভিডের কারণে ২০১৯ সালের চেয়ে ২০২০ সালে ১৪১টি কন্টেইনার জাহাজ কম এসেছে। জাহাজ কম আসায় স্বাভাবিবকভাবেই পণ্য উঠানামা কমে গেছে। আর রপ্তানিতে সবচে বড় ধাক্কাটা লেগেছে ২০২০ সালের এপ্রিল মাসে। সেই এপ্রিলে আমরা স্বাভাবিক সময়ে ৫৫ থেকে ৬০ হাজার একক পণ্য রপ্তানি করতাম, কিন্তু কভিডের কারণে সেটি নেমেছে ১৩ হাজার এককে। সেই ধাক্কা স্বাভাবিক হতে নভেম্বর পর্যন্ত সময় লেগেছে। ফলে চট্টগ্রাম বন্দরের দক্ষতা-গতিশীলতা কভিড সময়ে পণ্য উঠানামা কমেনি,এটা নির্দ্বিধায় বলা যায়।
সাইফ মেরিটাইম লিমিটেডের চিফ অপারেটিং অফিসার আবদুল্লাহ জহীর বলেন, ‘বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি আমদানি হয় চীন থেকে। করোনা মহামারি শুরুর পর দেশের আমদানিকারকরা চীন থেকে পণ্য আনার জন্য ঋণপত্রও খুলতে পারেননি। চীন অনেকদিন ধরে তাদের রফতানি কার্যক্রম বন্ধ রেখেছিল। এ কারণে পণ্য উঠানামা কমেছে। সেইসাথে ট্রান্সশিপমেন্ট বন্দরগুলোতে লকডাউনের কারণে ব্যাপক জাহাজজট লেগেছিল। এর প্রভাবে চট্টগ্রামে পণ্য পরিবহন কমেছে। এর প্রভাবে স্বাভাবিকভাবেই পণ্য উঠানামাও কমেছে।
লয়েডস লিস্ট প্রকাশিত তালিকায় বরাবরের মতোই প্রথম স্থানে চীনের সাংহাই বন্দর; তবে তার প্রবৃদ্ধি মাত্র ০.৫ শতাংশ। দ্বিতীয় স্থানে থাকা সিঙ্গাপুর বন্দরে পণ্য হ্যান্ডলিং কমেছে ০.৯ শতাংশ। তবে তৃতীয় স্থানে থাকা চীনের নিংবো-জোশান বন্দরের প্রবৃদ্ধি ৪ শতাংশ বেড়েছে। চতুর্থ স্থানে থাকা শেনজেন বন্দরের প্রবৃদ্ধি ৩ শতাংশ; পঞ্চম স্থানে থাকা গোয়াংজু ১ দশমিক ৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। তালিকায় থাকা ১০০টি বন্দরের মধ্যে ২৫টিই চীনের সমুদ্রবন্দর।
আর তালিকায় দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশের আগে আছে ভারতের মুন্দ্রা বন্দর; তাদের প্রবৃদ্ধি প্রায় ২০ শতাংশ। ৩৯ নম্বরে থাকা ভারতের জওহরলাল নেহরু বন্দরের প্রবৃদ্ধি কমেছে সাড়ে ১২ শতাংশ। চট্টগ্রাম বন্দরের পরে পাকিস্তানের করাচি বন্দরের অবস্থান ৮৬তম; তাদের প্রবৃদ্ধিও কমেছে ০.৯ শতাংশ।
নয় ধাপ পিছিয়ে যাওয়ার তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণ দিয়ে চট্টগ্রাম বন্দর পরিচালক (পরিবহন) এনামুল করিম বলেছেন, ২০১৮-১৯ অর্থবছরের জুলাই থেকে ফেব্রুয়ারি-আট মাসে চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্য উঠানামা হয়েছে ১৯ লাখ ৭১ হাজার একক। ২০১৯-২০ অর্থবছরের একই সময়ে পণ্য উঠানামা হয়েছে ২১ লাখ ৯৭ হাজার একক। ২০২০ সালের মার্চ থেকে করোনা শুরু হয়েছে। মার্চ-জুন চার মাসে পণ্য উঠানামা কমেছে প্রায় ১৫ শতাংশ। শুধু এপ্রিলেই পণ্য উঠানামা কমেছে ৪৫ শতাংশ। ফলে পণ্য উঠানামা কমার জন্য কভিড ধাক্কাই মূল কারণ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *