কর্ণফুলী নদী খননে আড়াই বছরে অগ্রগতি ৩১ শতাংশ

0
915

বিশেষ প্রতিনিধি
কর্ণফুলী নদীর খননকাজে গত আড়াই বছরে অগ্রগতি হয়েছে মাত্র ৩১ শতাংশ। দেশিয় প্রযুক্তিতে এখন খনন কাজ চলছে নামমাত্র। খননকাজ নিয়মিত না হওয়ায় একদিকে পলি জমে নদী ভরাট হচ্ছে, অন্যদিকে জাহাজ চলাচলে ঝুঁকি বাড়ছে। নদী খনন ঠিকমতো না হওয়ায় সদরঘাটে নির্মিত লাইটার জেটি সচল করতে পারেনি বন্দর কর্তৃপক্ষ।
এই জটিল পরিস্থিতিতে কর্ণফুলী নদীর ড্রেজিং প্রকল্পের ব্যয় দ্বিগুন বাড়ানোর প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে মন্ত্রনালয়ে; সময় বাড়ানোর আবেদনও জানানো হয়েছে। ২০১৮ সালে শুরু হওয়া ২৫৮ কোটি টাকার এ প্রকল্পের ব্যয় ৪৪০ কোটি টাকায় উন্নীত করতে নতুন করে প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। বর্তমানে প্রস্তাবটি বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) এর দল যাচাই-বাছাই করছে। তাদের সুপারিশের পর সংশোধিত প্রকল্প প্রস্তাব (আরডিপিপি) মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন পেলে নতুন উদ্যমে কাজ শুরু হবে বলে জানিয়েছে বন্দর কর্তৃপক্ষ।

খনন প্রকল্পে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কর্ণফুলী নদী খননে সবচে বড় সমস্যা পলিথিনের কারণে ড্রেজার কাজ করছে না। এরফলে কাজ এগোয়নি; বাড়তি সময় লাগছে। কিন্তু তখন বুয়েটের স্টাডি রিপোর্টের ভিত্তিতেই কর্ণফুলী নদী খনন শুরু হয়। খননের সময় পলিথিন আর পলিথিন। প্রশ্ন উঠেছে মাঠ পর্যায়ে জরিপ না করেই বুয়েট স্টাডি রিপাের্ট করেছে কিনা? কারণ স্টাডি সঠিক হলে নদীর নীচে পলিথিন থাকার বিষয়টি আসতো। এখন আবারো বুয়েটের রিপোর্ট নিয়ে খনন কাজ শুরু হলে কাজ আগাবে কিনা তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।

ক্যাপিটাল ড্রেজিং প্রকল্পের পরিচালক ও চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চিফ হাইড্রোগ্রাফার কমান্ডার এম আরিফুর রহমান বলছেন, ‘পলিথিনের কারণে ড্রেজিং ব্যাহত হচ্ছে। সে জন্য প্রকল্পটি সংশোধন করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। নৌবাহিনী সংশোধিত প্রকল্প প্রস্তাব তৈরি করেছে। তা পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে বুয়েটে। সংশোধিত প্রস্তাবে ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৪০ কোটি টাকা। আগে ৪২ লাখ ঘনমিটার বালি উত্তোলনের কথা ছিল। এখন তা বেড়ে দাঁড়াবে ৫০ লাখ ঘনমিটার। আরডিপিপি-তে প্রতি ঘনমিটার বালির উত্তোলন ব্যয় ধরা হয়েছে ৬৭০ টাকা।’

তিনি জানান, সম্প্রতি প্রকল্প যাচাই কমিটির একটি সভা হয়েছে। তাতে নৌ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে প্রস্তাবিত ব্যয় কমাতে বলা হয়। সংশোধিত প্রস্তাবে বিদেশ থেকে বড় আকারের ২টি ড্রেজার এনে কাজ করার কথা বলা হয়েছে। তবে এর সঙ্গে কিছুটা ভিন্নমত পোষণ করে দেশীয় ড্রেজারের সংখ্যা বাড়িয়ে ব্যয় কমানো যায় কি না, তা পরীক্ষা করে দেখতে বলেছে মন্ত্রণালয়। আগামী সপ্তাহে বুয়েটের চূড়ান্ত প্রতিবেদন পাওয়া যেতে পারে। এরপর তা অনুমোদনের জন্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। অনুমোদন পাওয়া গেলে সংশোধিত প্রকল্পের কাজ শুরু করা সম্ভব হবে। তবে প্রকল্পটির কাজ থেমে নেই। প্রতিদিন গড়ে ৬-৭টি ড্রেজার কাজ করছে। এখন পর্যন্ত প্রায় ৩১ শতাংশ কাজ হয়েছে। তবে ঠিক যে গতিতে কাজ হওয়ার কথা ছিল পলিথিনের প্রতিবন্ধকতায় তা হয়নি। এ ছাড়া করোনার কারণে কয়েক মাস কাজ হয়েছে ধীরগতিতে।

ব্যয় বাড়ার কারণ জানতে চাইলে বন্দরের এই কর্মকর্তা বলেন, আগে প্রকল্প যেভাবে তৈরি করা হয়েছিল, তাতে ড্রেজারের মাধ্যমে খনন করে পাইপের সাহায্যে বালি নির্দিষ্ট জায়গায় ফেলার কথা ছিল। কিন্তু নদীর তলদেশে পলিথিনের কারণে সেই পদ্ধতিতে কাজ করা যাচ্ছে না। স্থানীয় গ্রেভ ড্রেজারে বালু তুলে তা বার্জে বোঝাই করতে হচ্ছে। তারপর অন্য জায়গায় নিতে হচ্ছে। সেখান থেকে আবার অন্য কোনো যানবাহন ব্যবহার করে বহন করতে হচ্ছে বালি। এসব কারণসহ আরও কিছু কারণে ব্যয় বাড়ছে।

দেশের আমদানি-রফতানির ৯০ শতাংশই চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে হয়। আর দেশের প্রধান এই সমুদ্রবন্দরটি কর্ণফুলী নদীর নাব্যতার ওপর নির্ভরশীল। বন্দরের জেটিসহ গুরুত্বপূর্ণ প্রায় সব স্থাপনাই কর্ণফুলীর তীর ঘেঁষে গড়ে উঠেছে। বন্দরের গতিশীলতা বজায় রাখতে কর্ণফুলীতে ক্যাপিটাল ড্রেজিংয়ের দাবি দীর্ঘদিনের।

চট্টগ্রাম বন্দর সূত্র জানায়, ২৫৮ কোটি টাকা ব্যয়ে ‘কর্ণফুলী নদীর সদরঘাট থেকে বাকলিয়া চর পর্যন্ত ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে নাব্যতা বৃদ্ধি প্রকল্প’ বাস্তবায়নে ২০১৮ সালের মে মাসে নৌবাহিনীর সঙ্গে বন্দরের চুক্তি হয়। নৌ বাহিনী পরে ই-ইঞ্জিনিয়ার্স নামক একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়।

বর্তমানে নৌবাহিনীর তত্ত্বাবধানে প্রতিষ্ঠানটি খনন কাজ করছে। প্রকল্পের সময়সীমা চার বছর। এরইমধ্যে প্রায় আড়াই বছর সময় পার হয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে নদীর গভীরতা চার মিটার বাড়ার পাশাপাশি পলি জমে অচল হয়ে পড়া বন্দরের ৪০০ মিটার লাইটার জেটিও সচল হবে। নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনেও প্রকল্পটি ভূমিকা রাখবে।

প্রকল্পের কাজ শুরুর পরই খনন নিয়ে দেখা দেয় জটিলতা। কারণ, ড্রেজার মেশিন ঠিকভাবে কাজ করছিল না। এর কারণ পলিথিন। বিভিন্ন খাল হয়ে পলিথিন ও অন্যান্য কঠিন বর্জ্য নদীর তলদেশে জমে গেছে। বারবারই পলিথিনে আটকে যাচ্ছিল ড্রেজার মেশিন। এমন পরিস্থিতিতে চীন থেকে আনা হয় অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ৩১ ইঞ্চি ব্যাসের একটি সাকশন ড্রেজার।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here