একবছরেই দুটি পদ্মাসেতুর সমান রাজস্ব আয় চট্টগ্রাম কাস্টমসের

Dhaka Post Desk

বিশেষ প্রতিনিধি

8 August, 2022

Views

এক অর্থবছরে ৫৯ হাজার কোটি টাকার রেকর্ড রাজস্ব আয় করেছে চট্টগ্রাম কাস্টমস। এই বিপুল রাজস্ব আয়ের রেকর্ড চট্টগ্রাম কাস্টমসের ইতিহাসে তো বটেই, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের অধীন কোনো প্রতিষ্ঠান কিংবা বাংলাদেশের অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের নজিরে নেই।সদ্য সমাপ্ত ২০২১-২২ অর্থবছরে রাজস্ব আয়ের হার আগের অর্থবছরের চেয়ে ১৫ শতাংশ বেশি। যে পরিমান রাজস্ব দেশের একটি কাস্টম হাউস জমা দিয়েছে তা দিয়ে অন্তত দুটি নতুন পদ্মাসেতু নির্মান সম্ভব।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড সদ্য সমাপ্ত ২০২১-২২ অর্থবছরে ৩ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আয়ের লক্ষমাত্রা ঠিক করেছে। এরমধ্যে প্রায় ১৮ শতাংশ একাই জমা দিয়েছে চট্টগ্রাম কাস্টমস। আর আমদানি শুল্ক বাবদ রাজস্ব আয়েরপ্রায় ৬২ শতাংশ একই জমা দিয়েছে এই কাস্টম হাউস।

উল্লেখ্য, দেশের মোট আমদানি বাণিজ্যের ৮২ শতাংশ এবং রপ্তানি বাণিজ্যের ৯১ শতাংশই পরিচালিত হয়ে দেশের প্রধান চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে। ফলে এই বন্দর দিয়ে পণ্য আমদানি-রপ্তানির ওপরই চট্টগ্রাম কাস্টমসের রাজস্ব বাড়া-কমা অনেকটাই নির্ভরশীল। চট্টগ্রাম কাস্টমসে রাজস্ব আয়ে সবচে বড় খাত থেকে রাজস্ব আয় কমেছে; গাড়ি আমদানি ব্যাপকভাবে কমেছে; বিলাসবহুল পণ্যের শুল্ক বাড়ানোর কারণে আমদানি কমেছে। সেইসাথে ভোজ্যতেল, গম, চিনি, চালসহ অনেক ভোগ্যপণ্যে শুল্ক হার কমানোর কারণে রাজস্ব আয় আগের বছরের চেয়ে বাড়ানো অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং ছিল। কিন্তু চট্টগ্রাম কাস্টমস কমিশনার নিজস্ব কিছু কৌশল প্রয়োগ করে, মিথ্যা ঘোষণায় পণ্য আমদানিতে কঠোর হয়ে এবং নজরদারি বাড়ানোর কারণে এই সাফল্য এসেছে।
চট্টগ্রাম কাস্টমস কমিশনার মোঃ ফখরুল আলম বলেন, সরকারী-বেসরকারী অন্তত সাতটি প্রতিষ্ঠান গত পাঁচমাস ধরে জ্বালানি তেল, এলএনজি ছাড় নিয়েছে কিন্তু রাজস্ব জমা দেয়নি। এই প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব জমা পড়েনি; অথছ পণ্য জাহাজ থেকে নামিয়ে ছাড় করে নিয়েছে। এই বিপুল টাকা জমা পড়লে আমার রাজস্ব আয় দাঁড়াতো ৬৩ হাজার কোটি টাকা। আর এর আগের অর্থবছর ২০২-২১ এর তুলনায় এবার প্রবৃদ্ধি হতো সাড়ে ২২ শতাংশ। কিন্তু হয়েছে ১৫ শতাংশ।

উল্লেখ্য, রাজস্ব বোর্ডের লক্ষমাত্রা অনুযায়ী কাস্টমসের এবার রাজস্ব আয় করতে হতো ৬৪ হাজার কোটি টাকা; যদিও এই লক্ষমাত্রা বেশ কবছর ধরেই দেশের কোন শুল্ক স্টেশন পুরণ করতে পারে না। এটা জেনেও আগের আয়ের হিসাব-নিকাশ বিবেচনায় না নিয়েই প্রতিবার বাড়তি রাজস্ব লক্ষমাত্রা নির্ধারন করে কাস্টমস।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে কী পরিমান পণ্য আমদানি-রপ্তানি হচ্ছে তার ওপর নির্ভর করে চট্টগ্রাম কাস্টমসের রাজস্ব আয়। চট্টগ্রাম বন্দরের হিসাবে, সদ্য সমাপ্ত ২০২১-২২ অর্থবছরে ৩২ লাখ ৫৫ হাজার একক কন্টেইনার উঠানামা হয়েছে; আর সাধারন পণ্য উঠানামা হয়েছে ১১ কোটি ৮১ লাখ টন। কন্টেইনার ও সাধারন দুই ধরনের পণ্য উঠানামায় রেকর্ড গড়েছে দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর। কন্টেইনার উঠানামায় প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৫ শতাংশ আর কার্গো উঠানামায় প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৪ শতাংশ। ফলে রাজস্ব আয় বাড়ার জন্য আমদানি-রপ্তানি দুটি সূচকই বেড়েছে। তবে শুধুমাত্র আমদানি-রপ্তানি বাড়লেই যে রাজস্ব আয় প্রবৃদ্ধি বাড়বে এমনটি বলার সুযোগ নেই। কারণ আমদানি পণ্যের মধ্যে বেশি রাজস্বের পণ্যের আমদানি বেড়েছে কিনা; কম রাজস্বের পণ্যের আমদানি কেমন হলো সেগুলো বিবেচনায় থাকে। কাস্টমসের হিসাবে, এবার পাথর আমদানি কমেছে; প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানি কমেছে, বিটুমিন ও মোটর সাইকেল আমদানি কমেছে। অথচ এসব পণ্য থেকে সরকার আগের বছর ভালো পরিমান শুল্ক পেয়েছিল।
এবার করোনা ধকল কাটিয়ে ভোগ্যপণ্যের উচ্চমূল্য নিয়ন্ত্রনে শুল্ক কমিয়েছে সরকার। একইসাথে দেশিয় শিল্প সুরক্ষায় বিদেশ থেকে সেই পণ্য আমদানিতে শুল্ক বাড়িয়েছে। সেইসাথে বিলাসবহুল পণ্য আমদানি নিয়ন্ত্রন করতে বাড়তি শুল্ক আরোপ করেছে সরকার। এসব কারণে রাজস্ব আয় বাড়িয়ে আদায় করা চ্যালেঞ্জিং ছিল।
রাজস্ব প্রবৃদ্ধি বাড়াতে নিজস্ব কিছু কৌশল থাকে কাস্টমসের। সেই কৌশল ভালোভাবেই প্রয়োগ করেছে কাস্টমস। সেটি কী জানতে চাইলেকাস্টমস কমিশনার বলেন, শিল্প সুরক্ষা দিতে সরকার অনেকপণ্যের আমদানি শুল্ক বাড়িয়েছে; আবার দেশের বাজারে পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রনে শুল্ক কমিয়েছে। বিলাসবহুল পণ্যের ওপরও শুল্ক বাড়িয়েছে। এসব কারণে এই পণ্যের আমদানি কমেছে। ফলে শুল্ক আয় বাড়ানো আমাদের জন্য চ্যালেঞ্জিং ছিল। কিন্তু অনিয়ম নিয়ে জিরো টলারেন্স, মিথ্যা ঘোষণায় পণ্য আমদানিতে কড়াকড়ি ওজরিমানা, নিষিদ্ধ পণ্য আমদানি ও চোরাচালান বন্ধে তীক্ষè নজরদারি আমাদের রাজস্ব আয় প্রবৃদ্ধি অর্জনে বড় ধরনের সহায়তা করেছে।

আমদানি-রপ্তানিকারকের প্রতিনিধি হিসেবে কাস্টমসে মুল কাজটি করে সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টরা। জানতে চাইলে চট্টগ্রাম সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টস এসোসিয়েশন প্রথম যুগ্ম সাধারন সম্পাদক গোলাম রাব্বানি রিগ্যান কালের কণ্ঠকে বলেন, এত বিপুল রাজস্ব আয়ের প্রবৃদ্ধি অর্জন এটা অবশ্যই গৌরবের বিষয়। পাশাপাশি ২৬শ সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টরাও এর দাবিদার। তবে এটা ঠিক কমিশনার মহোদয়ের আন্তরিকতার পাশাপাশি রাজস্ব আয়ে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী যদি আরো সক্রিয় আন্তরিক থাকতেন তাহলে লক্ষমাত্রার বেশি রাজস্ব আয় করা সম্ভব হতো।

উল্লেখ্য, সদ্য সমাপ্ত ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেটে মোট রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে তিন লাখ ৮৯ হাজার কোটি টাকা। সেই লক্ষমাত্রা কতটা পুরণ হয়েছে সেটি এখনো জানায়নি রাজস্ব বোর্ড। তবে মোট রাজস্ব আয়ের লক্ষমাত্রার মধ্যে এনবিআরের লক্ষ্যমাত্রা তিন লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট থেকে সবচেয়ে বেশি অর্থাৎ এক লাখ ২৮ হাজার ৮৭৩ কোটি টাকা। আয়কর ও ভ্রমণ কর থেকে এক লাখ পাঁচ হাজার ৪৭৫ কোটি টাকা এবং আমদানি শুল্ক থেকে ৯৫ হাজার ৬৫২ কোটি টাকা আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published.