আমদানি পণ্য বন্দরের বদলে বেসরকারী কন্টেইনার ডিপোতে খালাসে খরচ বাড়বে

0
661

বিশেষ প্রতিনিধি
জাহাজ থেকে নামানোর পর সব ধরনের আমদানিপণ্য চট্টগ্রাম বন্দরের বদলে বেসরকারী কন্টেইনার ডিপোতে খালাস করতে চায় চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। মুলত বন্দরের ভিতর কন্টেইনার জট কমাতে এই পদক্ষেপ নিতে মন্ত্রনালয়ে চিঠি লিখে অনুমতি চেয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর।

কিন্তু চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহারকারীরা বলছেন, বেসরকারী কন্টেইনার ডিপোগুলো ৩৭ ধরনের পণ্য ছাড় দিতেই নাজুক অবস্থায় আছে। আর ডিপোতে পণ্য খালাস করতে ইচ্ছেমতো মাশুল আদায় হয়; এতে ব্যবসার ব্যয় বাড়বে। ফলে ডিপোগুলোর সক্ষমতা না বাড়িয়ে এখনই এই সিদ্ধান্ত নেয়া হবে আত্নঘাতি।

গত ২০২০ সালের ১ ডিসেম্বর জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআর) চিঠি দিয়ে সব পণ্য অফডকে খালাসের সুপারিশ করেছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। চিঠিতে বলা হয়েছে, বিশ্বের অন্য উন্নত বন্দরে সব এফসিএল কনটেইনারের পণ্য আমদানিকারকের চত্বরে বা অফডকে খালাস করা হয়। কিন্তু চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে আমদানি করা কনটেইনারের ২০-২২ শতাংশ অফডকে খালাস হয়, বাকি ৭০-৭৫ শতাংশ বন্দরের ভেতরে খুলে খালাস করা হয়। ফলে প্রতিদিন বন্দরের অভ্যন্তরে কয়েক হাজার ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান প্রবেশ করে। যা কনটেইনার জট, বন্দরের উৎপাদনশীলতা হ্রাস, রফতানি কার্যক্রমে ধীরগতিসহ সার্বিক নিরাপত্তাও বিঘ্নিত করে। এনবিআর থেকে ৩৭টি আইটেমের পণ্য অফডকে খালাসের অনুমতি রয়েছে। পর্যায়ক্রমে আইটেমের সংখ্যা বৃদ্ধি করে সম্পূর্ণরূপে ডেলিভারি কার্যক্রম আমদানিকারকের চত্বর বা অফডকে স্থানান্তর করা গেলে সমস্যার সমাধান হবে। এতে বন্দরের গতিশীলতা ফিরে এসে অপারেশনাল পরিচালনা সহজসাধ্য হয় এবং উৎপাদনশীলতা বজায় রাখা সম্ভব হয়।

সাধারণ ব্যবসায়ী ও আমদানিকারকরা বলছেন, বন্দরের চেয়ে অফডকে পণ্য খালাস করতে প্রায় দ্বিগুণ খরচ হয়। চট্টগ্রাম বন্দরে একটি ২০ ফুট কনটেইনারের আমদানি পণ্য খালাসে সর্বমোট খরচ (লিফট অন/অফ চার্জ, রিভার ডিউজ, লেবার চার্জ এবং এপ্রেইজিং লেবার চার্জ) হয় ৪ হাজার ৬১ টাকা। সেখানে অফডকে পণ্য খালাসে প্যাকেজ ডেলিভারি চার্জ ৭ হাজার ৯৩০ টাকা। এর সঙ্গে যুক্ত হয় লিফট অন/অফ চার্জ ১ হাজার টাকা, রিভার ডিউজ ৪০৮ টাকা এবং এক্সট্রা মুভমেন্ট চার্জ প্রায় ৫২ ডলারসহ সর্বমোট ১৩ হাজার ৭৫৫ টাকা। অন্যদিকে ৪০ ফুট কনটেইনারের ক্ষেত্রে বন্দরে সর্বমোট খরচ হয় ৫ হাজার ৬৯৯ টাকা। আর অফডকে সর্বমোট খরচ হয় ১৮ হাজার ৯২ টাকা। অর্থাৎ বন্দরের চার্জের দ্বিগুণের বেশি টাকা খরচ করে আইসিডিগুলো থেকে আমদানিকারকদের পণ্য খালাস করতে হচ্ছে।

এ বিষয়ে এফবিসিসিআই’র সহসভাপতি সিদ্দিকুর রহমান বলেন, সব পণ্য কন্টেইনার ডিপোতে নিয়ে খালাস করা যৌক্তিক নয়। অফডকে চার্জ বেশি। পণ্য খালাসেও নানারকম বিলম্ব আছে। এ অবস্থায় কোনোভাবেই অফডকে মালামাল খালাসের সিদ্ধান্ত ব্যবসায়ীদের চাপিয়ে দেয়া যাবে না। বন্দরের গতিশীলতা আনতে গ্রিন চ্যানেল চালু করতে পারে। অতীতের ব্যবসার সুনামের ভিত্তিতে দেশের স্বনামধন্য ব্যবসায়ীদের কাঁচামাল এই চ্যানেল দিয়ে করা যায়। তাছাড়া সব গেটে স্ক্যানার বসানো যায়। তাহলে সব পণ্য কায়িক পরীক্ষা করারও প্রয়োজন পড়বে না। তখন সময় সাশ্রয় হবে। বন্দরে জটও হবে না।

চট্টগ্রাম চেম্বার সভাপতি মাহবুবুল আলমও বলছেন, আমদানিকারক ও ব্যবসায়ীরা অফডকে কনটেইনার খালাস করতে চায় না। এমনিতেই নানা কারণে ব্যবসার ব্যয় বেড়ে গেছে। তার ওপর অফডকে বাড়তি চার্জ আদায় করা হয়। সময়মতো পণ্য খালাস করে না। বন্দর সেবামূলক সংস্থা। এ সংস্থার কাজ হচ্ছে ব্যবসায়ীদের সহায়তা দেয়া। কিন্তু তা না করে বন্দর অফডক প্রতিষ্ঠানের পক্ষাবলম্বন করছে, যা মোটেও সমীচীন নয়। বরং অফডকে যে ৩৭টি আইটেমের পণ্য খালাসের অনুমতি দেয়া আছে, তা বন্দর থেকে খালাসের ব্যবস্থা করা উচিত।

বিকেএমইএ’র প্রথম সহসভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ইতোমধ্যেই রফতানিকারকরা অফডকগুলোর কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে। তারা ইচ্ছামতো চার্জ বাড়ায়, যখন যা খুশি করে। নতুন করে সব পণ্য অফডকে খালাসের উদ্যোগ নেয়া হলে ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এতে অফডকগুলো মনোপলি ব্যবসার সুযোগ পাবে।

বর্তমানে ১৯টি বেসরকারী কন্টেইনার ডিপোর মধ্যে ১৮টি সচল আছে। এসব অফডকে ৩৭টি আইটেমের পণ্য খালাস হয়। কনটেইনার ডিপো মালিকদের সংগঠন বিকডা’র মহাসচিব রুহুল আমিন সিকদার বলেন, অফডকে খরচ কিছুটা বেশি। সেটা ব্যবসায়ীদের জন্য বোঝা হওয়ার কথা নয়। কারণ বন্দরে কনটেইনার পড়ে থাকলে এমনিতেই ডেমারেজ দিতে হয়। তার চেয়ে অফডক দ্রুত খালাস করা যায়। তাছাড়া বন্দরে ৪ দিনের পর থেকে স্টোর রেন্ট হিসাব করা হয়। কিন্তু অফডকে সম্পর্কের ভিত্তিতে ক্ষেত্রবিশেষে ১০ দিনও ফ্রি টাইম দেয়া হয়। তিনি আরও বলেন, ২০০৫ সাল থেকে প্রাইভেট আইসিডিগুলো প্রায় শতভাগ রফতানি পণ্যের কনটেইনার হ্যান্ডেল করছে। তাদের খরচ কি বেড়ে গেছে। শুধু আমদানি পণ্যের বেলায় কেন খরচ বৃদ্ধির প্রশ্ন আসছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here