আটদিন পর ‘এসওএল বাংলাদেশ’ জাহাজ বন্দর জেটিতে ভিড়লো কেন?

বিশেষ প্রতিনিধি
সব ধরনের কন্টেইনার জাহাজ বহির্নোঙরে আসার পর এক থেকে দুদিনের মধ্যে জেটিতে ভিড়তে পারলেও ‘এসওএল বাংলাদেশ’ জাহাজটি আর্শ্চয্যজনকভাবে জেটিতে ভিড়তে  নয়দিন সময় লেগেছে। জাহাজটিতে বাংলাদেশি আমদানিকারকদের ৯৭৪ একক পণ্যভর্তি কন্টেইনার ছিল। সেই জাহাজে গার্মেন্ট মালিকদের কাঁচামাল যেমন ছিল, জিপিএইচ স্টিলের পণ্য ছিল; সাথে ছিল বাংলাদেশ পুলিশের কিছু গাড়িও।
কারণ খুঁজতে গিয়ে জাহাজটির শিপিং লাইন জিবিক্স লজিস্টিকসে ফোন করা হলে তারা কোন সাড়াই দেয়নি। উপরন্তু একাধিক কর্মকর্তা বিষয়টি এড়িয়ে গেছেন। এরপর চট্টগ্রাম বন্দর, নৌ বানিজ্য দপ্তর ও পণ্যের আমদানিকারক এবং সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট’র সাথে বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে কারণ।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ‘এসওএল বাংলাদেশ’  জাহাজটি আগে ছিল ক্রেনযুক্ত (গিয়ারড); অর্থ্যাৎ জাহাজের নিজস্ব ক্রেন দিয়েই পণ্য উঠানামা করা হতো।  কিন্তু সম্প্রতি জাহাজটির ক্রেন কেটে ফেলে ‌’গিয়ারলেস বা ক্রেনবিহীন জাহাজে রুপান্তর করে জাহাজের মালিক কর্তৃপক্ষ। এরপর জাহাজটি ক্লাস সনদসহ বিভিন্ন সনদ নিয়ে ‘ক্রেনবিহীন জাহাজ’ হিসেবে চলাচলের অনুমতি নেয়। আগে থেকেই নিয়মিত চট্টগ্রাম রুটে পণ্য পরিবহন করলেও ক্রেনবিহীন জাহাজ হিসেবে কলম্বো বন্দর থেকে পণ্য নিয়ে জাহাজটি প্রথমবার চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে পৌঁছে ১৮ আগস্ট।
‘ক্রেনবিহীন জাহাজ’  হিসেবে চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছানোর পরই ঘটে বিপত্তি। বাদ সাধে প্রথমে নৌ বাণিজ্য অধিদপ্তর; পরে চট্টগ্রাম বন্দর।  সাতদিন ধরে বিভিন্ন দপ্তরের বিভিন্ন ধরনের তদবিরের পর ব্যর্থ হয়ে একপর্যায়ে জাহাজটির প্রিন্সিপালের নির্দেশে পণ্যসহ জাহাজটি পুণরায় কলম্বো বন্দরে ফেরত নেয়ার পরিকল্পনা করে। এই অবস্থায় আটদিন পর আজ ২৬ আগস্ট দুপুরে জাহাজটি চট্টগ্রাম বন্দর জেটিতে বার্থ নেয়। নৌ বাণিজ্য দপ্তর; চট্টগ্রাম বন্দর এর সাথে জাহাজ পরিচালনাকারী দেশিয় শিপিং এজেন্টের ফাইল চালাচালিতেই এই আটদিন সময় লাগলো।
আমদানি পণ্যসহ জাহাজটি চট্টগ্রাম থেকে ফেরত নেয়ার খবরে উদ্বিগ্ন হয়ে চট্টগ্রাম সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট এসোসিয়েশন সভাপতি একেএম আকতার হোসেন জিবিক্স লিজিস্টকসের অফিস গিয়ে কৈফিয়ত চান। কিন্তু তারা কোন সদুত্তর দিতে পারেনি।
জানতে চাইলে একেএম আকতার হোসেন বলছেন, চট্টগ্রাম বন্দরে এখন দিনে দিনেই জাহাজ বার্থিং পাচ্ছে। কিন্তু আটদিন আটকে থাকার কারণ খুঁজতে গিয়ে জানতে পারি; জাহাজটি পণ্য না নামিয়েই চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ফেরত যাবে। শিপিং লাইন হয়তো জাহাজ নিয়ে যেতে পারবে কিন্তু আমদানি পণ্যগুলো যে দিনের পর বহির্নোঙর পড়েছিল; তার আর্থিক ক্ষতি কে দেবে? আমাদের গ্রাহকরা নির্দিষ্ট সময়ে সেই আমদানি পণ্য পাননি। এর ক্ষতি কে দেবে?
শুধু তাই নয় জিপিএইচ ইস্পাতের ৩০ কন্টেইনার পণ্য ছিল জাহাজটিতে। তারাও বিপদে পড়েছেন নির্দিষ্ট সময়ে আমদানি পণ্য না পেয়ে।
জিপিএইচ ইস্পাতের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে বলেছেন, চট্টগ্রাম বন্দরের এই কাজটি করা একেবারেই উচিত হয়নি। জাহাজের ত্রুটি থাকলে কোন একটি কৌশল প্রয়োগ করে জাহাজ ভিড়িয়ে পণ্য নামানোর সুযোগ দিতে পারতো কিন্তু সেটি না করেই আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় ফেলে আটদিন পণ্যগুলো নামানোর সুযোগ না দেয়াটা গর্হিত কাজ।
পিআইএল বাংলাদেশের এক কর্মকর্তা বলেছেন, ৫/৬ মাস আগেও আমাদের দুটি জাহাজকে গিয়ারড থেকে গিয়ারলেস করা হয়েছে। ব্যবসায়িক প্রয়োজনেই আমাদেরকে সেই কাজটি করতে হয়। তখন কোন ঝামেলা পোহাতে হয়নি। ‘এসওএল বাংলাদেশ’  জাহাজের ক্ষেত্রে এমন হয়রানি ঠিক হয়নি। এতে বিদেশে চট্টগ্রাম বন্দরের খারাপ বার্তা গেছে।
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম বন্দরের কেউই মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে চট্টগ্রাম বন্দরের এক শীর্ষ কর্মকর্তা বলেছেন, যথাযথ ডকুমেন্ট সরবরাহ করেনি শিপিং লাইন। ফলে অনুমোদন দিতে আমাদের বাড়তি সময় লেগেছে। আর ২৫ বছরের পুরণো পণ্যবাহি জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দর জেটিতে ভিড়ানো আমরা নিরুৎসাহিত করছি। সেই সাথে এই ধরনের ক্রেন কেটে ফেলা জাহাজকে অনুৎসাহিত করা হচ্ছে। শেষপর্যন্ত আমরা জাহাজটি ভিড়তে অনুমোদন দিয়েছি।
অভিযোগ উঠেছে, নৌ বাণিজ্য দপ্তরের সার্ভে টিমও জাহাজটির ফিটনেস দিতে হয়রানি করেছিল। উদ্দেশ্য লেনদেন করা। এজন্য প্রতিষ্ঠানটি একের পর এক ডকুমেন্ট চেয়ে পাঠিয়েছিল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *