আউটার রিং রোড ও বে টার্মিনাল – খাল ভরাট করে টার্মিনাল করছে বন্দর

নিজস্ব প্রতিবেদকচট্টগ্রাম
সাগর পাড়ের আউটার রিং রোডের দক্ষিণ কাট্টলী রাসমনি ঘাট থেকে পতেঙ্গার দিকে একটু অগ্রসর হলেই চোখে পড়বে স্লুইস গেট। কিন্তু সাগরের দিকে স্লুইস গেটের প্রান্ত থাকলেও বিপরীত দিকে (স্থলভাগ প্রান্তে তথা শহর প্রান্তে) কোনো খাল নেই। অর্থাৎ, শহর প্রান্তে এই স্লুইস গেটের কোনো মুখ নেই। এই স্লুইস গেট থেকে আরেকটি সামনে অগ্রসর হলে হালিশহর ফইল্যাতলি প্রান্ত থেকে আসার রোডের বিপরীত দিকে আরো একটি স্লুইস গেট করা হয়েছে। এটিরও একই অবস্থা। সাগরের দিকে থাকলেও শহরের দিকে নেই। হালিশহর আর্টিলারি সেন্টার স্কুলের বিপরীত পাশে পাঁচ ব্যান্ডের একটি বড় স্লুইস গেইট করা হলেও শহরের দিকে কোনো প্রান্ত খুঁজে পাওয়া যায়নি। আবার হালিশহর চৌচালা পয়েন্টে সাগরের দিকে স্লুইস গেটের মুখ বন্ধ করে বে টার্মিনালের সীমানা দেয়াল নির্মাণ করেছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ।
শুধু স্লুইস গেটের মুখে সীমানা দেয়ালই নির্মাণ করেনি, প্রাকৃতিক খালটিও মাটি ভরাট করে বন্ধ করেছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। খালের অস্তিত্ব খুঁজতে গুগল ম্যাপ বিশ্লেষন করে দেখা যায়, মাটি ভরাটের শেষ প্রান্ত থেকে সাগরের দিকে একটি খালের প্রবাহ রয়েছে। আর এতেই বুঝা যায় বে- টার্মিনালে মাটি ভরাটের সময় খালটি ভরাট করা হয়েছে।
শুধু কি তাই? ১৪ কিলোমিটার দীর্ঘ আউটার রিং রোডের বন্দরটিলা আকমল আলী রোডের কাছ থেকে শুরু হয়ে দক্ষিণ কাট্টলী রাসমনি ঘাট পর্যন্ত নির্মিত হবে বে টার্মিনাল। কিন্তু দীর্ঘ এই অংশে সাগরের ঢেউ থেকে আউটার রিং রোডকে রক্ষায় সিডিএ সিমেন্টের ব্লক বসিয়েছে। বে টার্মিনালের কারণে এখানে তো সাগরের পানি আসবে না, তাহলে কি এই ব্লকের প্রয়োজনীয়তা ছিল? চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) প্রধান প্রকৌশলী এবং আউটার রিং রোড প্রকল্পের পরিচালক কাজী হাসান বিন শামস বলেন,‘ আমরা বে টার্মিনালের আগে প্রকল্পটি নিয়েছি। তাই সাগরের ঢেউ থেকে উপকূলীয় বাঁধ কাম রোডটিকে রক্ষায় এসব ব্লক বসানো হয়েছে। এটা এখন পর্যন্ত দেশের সবচেয়ে বড় সুপার ডাইক। তবে যদি বন্দর কর্তৃপক্ষ থেকে বে টার্মিনালের পরিকল্পনা আগে থেকে জানা হতো তাহলে এসব ব্লক না বসালেও হতো। এই বাড়তি অর্থের অপচয় হয়েছে শুধুমাত্র সমন্বয়হীনতার কারণে।’
তিনি আরো বলেন, ‘আমরা বে টার্মিনালকে ছাড়পত্র দিয়েছি আমাদের রোডের বটম ( নিচের প্রান্ত) থেকে ১০০ মিটার দূরে করার জন্য। কিন্তু তারা বটম থেকে ১৩ মিটার দূরে বাউন্ডারি দেয়াল নির্মাণ করেছে।’
সিডিএ’র প্রধান প্রকৌশলীর বক্তব্যের সাথে একমত পোষন করে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার এডমিরাল এম শাহজাহান বলেন, ‘যেহেতু আমরা বে টার্মিনাল করছি। ফলে সাগরের পানি রিং রোডের দিকে যাবে না। তাই এখানে ব্লক দেয়ার কোনো প্রয়োজন ছিল না এবং এতে অর্থের অপচয় হয়েছে এটা সঠিক।’
কিন্তু রিং রোডের শেষ প্রান্ত থেকে ১০০ মিটার বাফার জোন রাখার বিজ্ঞানভিত্তিক কোনো কারণ নেই বলে জানান চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার এডমিরাল এম শাহজাহান। তিনি বলেন,‘ সাড়ে ছয় কিলোমিটার দীর্ঘ বে টার্মিনালে ১০০ মিটার চওড়া জায়গা খালি রাখার কোনো যৌক্তিকতা নেই। এই জায়গায় আমরা অনেক কনটেইনার রাখতে পারবো। তাই আমরা জায়গা খালি রাখিনি।’
শহর প্রান্তে স্লুইস গেটের মুখ নেই কেন?
সাগরিকা থেকে পতেঙ্গা পর্যন্ত ১৪ কিলোমিটার দীর্ঘ সড়কে আগে ৭টি স্লুইস গেট ছিল। এখন করা হয়েছে ১১টি। কিন্তু বাড়তি চারটি স্লুইশ গেটের সাথে শহর প্রান্তে কোনো সংযোগ নেই। এবিষয়ে সিডিএ’র প্রধান প্রকৌশলী ও আউটার রিং রোড প্রকল্পের পরিচালক কাজী হাসান বিন শামস বলেন,‘ শহর প্রান্তে টোল রোড রয়েছে। আগামীতে এই রোডটি আট লেনের উন্নীত করনের প্রকল্প রয়েছে। সেই প্রকল্পের আওতায় আউটার রিং রোড থেকে স্লুইস গেটের প্রান্ত টোল রোডের নিচ দিয়ে শহর প্রান্তের সাথে সংযোগ করা হবে। এছাড়া যে অংশে খাল নেই, সেই অংশে আমরা রিং রোডের সমান্তরালে একটি খাল খননের পরিকল্পনাও করেছি।’

কিন্তু খাল ছাড়া স্লুইশ গেটের সংখ্যা বাড়ানো হলো কেন? এই প্রশ্নের জবাবে কাজী হাসান বিন শামস বলেন,‘ চট্টগ্রাম শহরের জলাবদ্ধতার আগামী ৫০ থেকে ১০০ বছরের উপর ভিত্তি করে পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের রিপোর্টের সাপেক্ষে স্লুইশ গেটের সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। এসব স্লুইশ গেটের সাথে আগামীতে খালের সংযোগ করা হবে।’

সিডিএ প্রধান প্রকৌশলীর বক্তব্যের বিষয়ে কথা হয় সড়ক ও জনপথ বিভাগের সাথে। সড়ক ও জনপথ বিভাগ তাদের টোল রোডের সম্প্রসারণের আওতায় স্লুইস গেটের প্রান্ত শহর প্রান্ত পর্যন্ত বর্ধিত করবে কিনা জানতে চাইলে চট্টগ্রাম সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হাফিজুর রহমান বলেন,‘ আমরা আমাদের প্রকল্পের আওতায় এসব স্লুইস গেট বর্ধিতাংশ করে দেবো। তাই আগামীতে হয়তো এই সমস্যা থাকবে না।’ তবে এই বর্ধিতাংশ প্রকল্প কবে নেয়া হবে সে বিষয়ে সঠিকভাবে তিনি কিছু জানাতে পারেননি। কারণ এই টোল রোডটি আট লেনে উন্নীত করনের কথা গত চার বছর ধরে শুনা যাচ্ছে। ইতিমধ্যে এই প্রকল্পের চূড়ান্ত সমীক্ষাও সম্পন্ন করা হয়েছে।
বে টার্মিনালের ভেতরে কোনো খাল থাকবে না
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ বে টার্মিনালে মাটি ভরাট করতে গিয়ে একটি খাল ভরাট করেছে। এই খাল ভরাট প্রসঙ্গে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার এডমিরাল এম শাহজাহান বলেন,‘ আমরা বে টার্মিনালের মধ্যবর্তী যতো খাল আছে সবগুলো ভরাট করবো। টার্মিনালের ভেতর দিয়ে কোনো পানির প্রবাহ সাগরে গিয়ে পড়বে না। নগরীর বারিক বিল্ডিং পয়েন্ট দিয়ে একটি বক্স কালভার্ট বন্দরের এক ও দুই নম্বর জেটির কাছ দিয়ে কর্ণফুলীতে পড়ায় ওই অংশে আবর্জনা জমে জেটি ভরাট হয়ে যাচ্ছে। নিয়মিত ড্রেজিং করেও ড্রাফট বাড়ানো যাচ্ছে না। তাই বে টার্মিনালের মধ্য দিয়ে কোনো খাল বা ড্রেন সাগরে মিলিত হতে দেয়া হবে না।’
তাহলে নগরীর ভেতর থেকে স্লুইস গেটের মাধ্যমে আসা পানিগুলো কিভাবে সাগরে গিয়ে পড়বে? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন,‘ বর্তমানে বিদ্যমান জায়গায় রিং রোডের সমান্তরালে একটি বড় ড্রেন নির্মাণ করা হবে। সেই ড্রেন দিয়ে পানি বে টার্মিনালের দক্ষিণ প্রান্ত দিয়ে সাগরে পড়বে। সেই হিসেবে আউটার রিং রোডে স্লুইস গেট নির্মাণের প্রয়োজন ছিল না।’
সমন্বয়ের বিকল্প নেই
সিডিএ স্লুইস গেট নির্মাণ করেছে, কিন্তু খাল নেই। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ আবার খালগুলো ভরাট করবে। এমন সমন্বয়হীনতা প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার এডমিরাল এম শাহজাহান বলেন,‘সিডিএ’র যদি আমাদের সাথে সমন্বয় করে কাজ করতো তাহলে এই সমস্যা হতো না। তারপরও এখন দুই সংস্থা সমন্বয়ের মাধ্যমে আগামী পরিকল্পনা গ্রহন করা যায়।’
কিন্তু সিডিএ’র প্রধান প্রকৌশলী কাজী হাসান বিন শামস বলেন, ‘সিডিএ’র পক্ষ থেকে দফায় দফায় বলা হলেও বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে কোনো আশানুরুপ সাড়া পাওয়া যায়নি। এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের সমস্যা নিয়ে বন্দর কর্তৃপক্ষের সাথে আলোচনা করে যেভাবে সমাধান করা হয়েছে বে টার্মিনাল ও আউটার রিং রোড নিয়েও তা করার সুযোগ ছিল। এতে রাষ্ট্রের অর্থের অপচয় রোধ হতো। তবে এখন সমন্বয়ের কাজ চলছে।’
সমন্বয় প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম বলেন, নগরী থেকে পানি বের হওয়ার জন্য খালগুলো সক্রিয় না থাকলে অতিবর্ষণে চট্টগ্রাম শহরে জলাবদ্ধতা মারাত্মক রুপ ধারন করবে। বর্তমানে কম বৃষ্টি হচ্ছে বলে হয়তো তা অনুধাবন করা যাচ্ছে না। তাই বন্দর কর্তৃপক্ষ, সিডিএ ও সিটি কর্পোরেশনসহ সংশ্লিষ্ট সকলকে নিয়ে সমন্বয়ের মাধ্যমে কাজ করতে হবে।’
উল্লেখ্য, আউটার রিং রোড ও বে টার্মিনাল উভয় প্রকল্পই অন্যতম গুরুত্বপূর্ন প্রকল্প। রিং রোড একাধারে চার লেনের প্রধান সড়ক ও উপকূলীয় বাঁধ হিসেবে ব্যবহৃত হবে। আড়াই হাজার কোটি টাকার এই প্রকল্পটি চলতি বছরের ডিসেম্বরে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। অপরদিকে চট্টগ্রাম তথা দেশের অর্থনীতিতে এগিয়ে নিতে বে টার্মিনালের গুরুত্ব অপরিসীম। আগামীর বন্দর বলে খ্যাত এই বে টার্মিনালে তিনটি টার্মিনাল নির্মাণ করা হবে। এরমধ্যে একটি করবে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ এবং বাকি দুটি পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) ভিত্তিতে বিদেশী কোনো প্রতিষ্ঠানকে দেয়া হতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *