অবহেলিত নারী নাবিকরা, প্রশিক্ষিত নারী ক্যাডেটদের চাকরি নাই কোথাও !

0
116

নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম
এখনো বাণিজ্যিক জাহাজ পরিচালনার সুযোগ পাচ্ছেন না দেশের প্রশিক্ষিত বেকার নারী নাবিকরা। দেশের বিভিন্ন চ্যালেঞ্জিং পেশায় নারীর অংশগ্রহনের অংশ হিসেবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্যোগে মেরিন একাডেমিতেও নারীরা প্রশিক্ষণ নেয়ার সুযোগ পেয়েছেন। কিন্তু গত নয় বছরেও নারী নাবিকরা পেশা হিসেবে বাণিজ্যিক জাহাজে চাকরির সুবিধা থেকে বঞ্চিত। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার স্বপ্ন- স্বপ্নই রয়ে গেল।
সর্বশেষ গত মঙ্গলবার বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনে (বিএসসি) ১৬ জন পুরুষ নাবিককে স্থায়ী পদে নিয়োগ দেওয়া হলেও মৌখিক পরীক্ষা বাদ দেওয়া হয়েছে নারীদের। অভিযোগ উঠেছে, কোটা অনুসরণ করেনি বিএসসি কর্তৃপক্ষ। এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ বাংলাদেশ মেরিন একাডেমি থেকে প্রশিক্ষণ নেওয়া নারী ক্যাডেটরা।
জানা গেছে, চলতি বছরের এপ্রিলে বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের বিভিন্ন জাহাজে ১৬ জন স্থায়ী ডেক ও ইঞ্জিন ক্যাডেট নিয়োগের জন্য বিজ্ঞপ্তি দেয়। এই বিজ্ঞপ্তিতে নারী কিংবা পুরুষের কথা উল্লেখ করা হয়নি। তাই বাংলাদেশ মেরিন একাডেমি থেকে প্রশিক্ষণ নেওয়া প্রায় অর্ধশত নারী ক্যাডেট চাকরির জন্য আবেদন করেন। পরবর্তীতে শিক্ষাগত যোগ্যাতা বাচাই করে সংক্ষিপ্ত তালিকা করে বিএসসি কর্তৃপক্ষ ৪৮ জন ডেক ক্যাডেট এবং ৩৭ জন ইঞ্জিন ক্যাডেটের তালিকা প্রকাশ করে। উভয় ক্যাটাগরিতে ১২ জন নারী ক্যাডেট উর্ত্তিণ হয়ে মৌখিক পরীক্ষায় অংশগ্রহনের জন্য নির্বাচিত হন।
গত মঙ্গলবার অর্থাৎ ৩০ জুন অনুষ্ঠিত হয় বিএসসির মৌখিক পরীক্ষা। এই পরীক্ষা শেষে ডেক ও ইঞ্জিন বিভাগে ১৬ জন ক্যাডেটের নাম চূড়ান্ত করা হয়। এদের মধ্যে কোনো নারী ক্যাডেটকে চূড়ান্তভাবে মনোনীত করা হয়নি। তবে ৪ জন করে দুই বিভাগে ৮ জনকে অপেক্ষমান রাখা হয়। এদের মধ্যে একজন রয়েছেন নারী ক্যাডেট।
পরীক্ষায় অংশগ্রহনকারী একাধিক নারী ক্যাডেট অভিযোগ করে বলেন, বিএসসি কর্তৃপক্ষ ইচ্ছাকৃতভাবে নারী ক্যাডেটদের বাদ দিয়েছে। নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে কোটা অনুসরণের কথা উল্লেখ থাকলেও তা অনুসরণ করা হয়নি।   এ বিষয়ে জানতে বিএসসির নিয়োগ কমিটির সদস্য সচিব ও মহাব্যবস্থাপক (শিপ পার্সোনেল) ক্যাপ্টেন আমীর মো. আবু সুফিয়ান এর সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, যারা অপানাদের অভিযোগ করেছে তাদের অনেকেই বিএসসি’র বিভিন্ন জাহাজে কর্মরত। এদের অধিকাংশ ক্লাস থ্রি সম্পন্ন অফিসার। তাদেকে কিভাবে ক্যাডেট পদে নিবো? প্রশ্ন করেন তিনি। একজনকে যোগ্য মনে হয়েছে। তাই তাকে নিয়েছি। বাকিদের মধ্য থেকে  যোগ্যতা যাচাই করে অফিসার পদে পর্যায়ক্রমে নেয়া হবে। এখানে নারী-পুরুষের ভেদাভেদ করা হয়নি।
তিনি আরো বলেন, বিএসসি ছাড়া দেশে অন্য কোনো শিপিং কম্পানি নারী ক্যাডেট কিংবা অফিসারদের চাকরি দিচ্ছে না। সরকারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে আমরাই (বিএসসি) একমাত্র নারীদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করছি।
নারী ক্যাডেট আরো জানান, দেশের সকল সেক্টরে নারীর অংশগ্রহন নিশ্চিতের লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী শেষ হাসিনা ২০১২ সালে মেরিন একাডেমিতে নারী ক্যাডেটদের ভর্তির উদ্যোগ নেন। ২০১২ থেকে ২০২১ এ পর্যন্ত বাংলাদেশ মেরিন একাডেমি থেকে ৮০ জন নারী ক্যাডেট পুরুষ ক্যাডেটদের সাথে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। প্রশিক্ষণ শেষে অনেকে সী টাইম সম্পন্ন করেছেন।
নারী নাবিকদের জাহাজে চাকরি দেয় না দেশি কোনো সংস্থা, দেশে জাহাজ কম্পানি রয়েছে ২১টি। এসব কম্পানির নিজস্ব জাহাজ রয়েছে ৬৭টি। ২০১২ সাল থেকে বাংলাদেশ মেরিন একাডেমিতে নারী ক্যাডটদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েও এখনো কোনো শিপিং কম্পানি দেশের নারী ক্যাডেটদের চাকরির ব্যবস্থা করেনি। তবে বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের বিভিন্ন জাহাজে মেরিন একাডেমির নারী ক্যাডেটদের সী টাইম (সী সার্ভিস) সম্পন্ন করার সুযোগ দিলেও চাকরিতে স্থায়ী নিয়োগ দেয়নি। নৌ মন্ত্রণালয় থেকে এ ব্যাপারে উদ্যোগ নেয়া হয়েও বাস্তবে কোনো কাজ হয়নি।
মেরিন একাডেমি থেকে প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করা বেশ কয়েকজন নারী ক্যাডেট নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার স্বপ্ন স্বপ্নই রয়ে গেল। শিপিং সেক্টরের চ্যালেঞ্জ নিতে প্রধানমন্ত্রীর আজ¦ানে সাড়া দিয়ে দেশের শিক্ষিত মেয়েরা মেরিন একাডেমিতে প্রশিক্ষণ নিয়েছে। কিন্তু পুরুষ শাসিত সমাজে দেশের নারীরা এখনো জাহাজ পরিচালনার সুযোগ পাচ্ছে না।
পরিসংখ্যান তুলে ধরে নারী ক্যাডেটরা বলেন, এ পর্যন্ত ৮০ জন নারী ক্যাডেট মেরিন একাডেমি থেকে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। এদের মধ্যে ১৯ জন ক্লাস থ্রি (থার্ড অফিসার) পরীক্ষা দিয়ে চাকরি খুজছেন বিভিন্ন শিপিং কম্পানিতে। বিভিন্ন কারণে ৪৯ জন প্রশিক্ষিত নারী ক্যাডেট ইতোমধ্যেই এই পেশা ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছেন। এদিকে ১২ জন নারী ক্যাডেট মেরিন একাডেমির প্রশিক্ষণ শেষ করলেও এখনো সী টাইম (সী সার্ভিস) সম্পন্ন করার সুযোগ পাননি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here