অবশেষে তিনটি জাহাজ বিক্রি করে ‘গলার কাটা’ সরাচ্ছে চট্টগ্রাম বন্দর

0
1572

বিশেষ প্রতিনিধি
জাহাজ কিনে পণ্য পরিবহন করা চট্টগ্রাম বন্দরের কাজ নয়; পণ্য উঠানামা সেবা দেয়াই মুলত কাজ বন্দরের। কিন্তু এখতিয়ারের বাইরে গিয়ে ২০১৩ সালে বন্দরের নিজস্ব তহবিল থেকে তিনটি জাহাজ কিনে চট্টগ্রাম বন্দর-পাঁনগাও টার্মিনাল রুটে পণ্য পরিবহন শুরু করে বন্দর কর্তৃপক্ষ। এই রুট জনপ্রিয় করতেই মুলত এসব জাহাজ কেনা হয় কিন্তু বন্দরের অনভিজ্ঞতার কারণে শেষপর্যন্ত সেটি সফল হয়নি।
পরে অনন্যোপায় হয়ে তিনটি জাহাজই একটি প্রতিষ্ঠানকে ভাড়ায় দেয়া হয়। প্রায় তিন বছর পরিচালনার পর অলাভজনক দেখিয়ে পুরো ভাড়া পরিশোধ না করে সেই প্রতিষ্ঠানটি জাহাজ তিনটি ফেরত দেয় বন্দর কর্তৃপক্ষকে। এরপর নানাভাবে জাহাজগুলো ভাড়া দেয়ার চেষ্টা করে বন্দর কর্তৃপক্ষ; কিন্তু গত প্রায় তিন বছরে সেই উদ্যোগও সফল হয়নি। এখন নিজেদের ‘গলার কাঁটা’ হয়ে উঠা তিনটি জাহাজই নিলামে বিক্রির চেষ্টা করছে বন্দর কর্তৃপক্ষ।
জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব মোহাম্মদ ওমর ফারুক বলেন, চট্টগ্রাম-পাঁনগাও নৌপথে পণ্য পরিবহন সচল করার জন্যই আমরা তিনটি জাহাজ কিনেছিলাম। তখণকার প্রেক্ষাপট ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। তখন এর কোনো বিকল্প ছিল না। আমরা যখন পণ্য পরিবহন শুরুকরেছিলাম তখন অনেক চড়াই-উতরাই পেরােতে হয়েছে।  এখন নৌ রুট অনেকটা সচল হয়েছে; বেসরকারী নয়টি জাহাজ এই রুটে চলাচল করছে। আমরা পথ দেখিয়েছি বলে ধকলটা আমাদের সইতে হয়েছে।
এখন তিনটি জাহাজই আমরা পুণরায় ভাড়া দেয়ার উদ্যোগ নিয়েছিলাম কিন্তু কাঙ্খিত ভাড়া মিলেনি তাই নিলামে বিক্রি ছাড়া ভালো কোন উপায় এই মুহুর্তে আমাদের কাছে নেই। তাই নিলামে বিক্রির জন্য সার্ভে করা হচ্ছে-যোগ করেন তিনি।

জানা গেছে, চট্টগ্রাম বন্দর থেকে নৌ পথে নারায়নগঞ্জের পাঁনগাওয়ে পণ্য পরিবহনের জন্য ২০১১ সালে পানগাঁও কনটেইনার টার্মিনাল নির্মান করে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। বন্দরের নিজস্ব তহবিল থেকে ১৭৭ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হয় টার্মিনালটি। টার্মিমালের নির্মাণকাজ শুরুর সময় ৩২টি কোম্পানি ওই রুটে কনটেইনার পরিবহনের জন্য জাহাজ চালানোর অনুমোদন নেয়। কিন্তু নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কোনো কোম্পানিই ওই রুটে জাহাজ নামাতে পারেনি। তখন বন্দরের উদ্যোগে ৫৬ কোটি টাকা ব্যয়ে তিনটি জাহাজ কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ২০১৩ সালের অক্টোবরে মালয়েশিয়ার ফেয়ার সি শিপিং থেকে কেনা ‌’পানগাঁও এক্সপ্রেস’  ও ‘পানগাঁও সাকসেস’ চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছে। ২০১৪ সালের শুরুতে এসে পৌঁছে ‘পানগাঁও ভিশন’। প্রতিটি জাহাজের কন্টেইনার পরিবহন ক্ষমতা ১২০ থেকে ১৪০ একক।

যাত্রা শুরুর পর ওই রুটে পণ্য পরিবহনে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে আশানুরূপ সাড়া মিলছিল না। এতে অধিকাংশ সময়ই জাহাজ তিনটি বেকার বসে ছিল। একপর্যায়ে বন্দর কর্তৃপক্ষ ভাড়া কমিয়ে অর্ধেক করে দেয় এরপরো সুফল মিলেনি। কিন্তু তিনটি জাহাজের মাসিক পরিচালন খরচ ঠিকই বহন করতে হচ্ছিল বন্দর কর্র্তৃপক্ষকে। ২০১৫ সালের ২ অক্টোবর জাহাজপ্রতি মাসিক ১৪ লাখ টাকায় সামিট গ্রুপকে তিনটি জাহাজই পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু ২০১৮ সালের এপ্রিলে অলাভজনক আখ্যা দিয়ে মাত্র ২ বছর ১০ মাসের মাথায় সামিট গ্রুপ জাহাজগুলো বন্দর কর্তৃক্ষকে ফেরত দেয়। বিপরিতে চুক্তি অনুযায়ী সব টাকা পরিশোধ না করে মাত্র এক কোটি টাকা পরিশোধ করে জাহাজ ফেরত দেয়। এরপর থেকে জাহাজগুলো কর্ণফুলী নদীতে নোঙর অবস্থায় পড়ে আছে।

অলস বসে থাকায় পরিচালন খরচ দিতে হচ।ছে একইসাথে জাহাজগুলো বসে থাকায় ধীরে ধীরে অকোজো হয়ে যাচ্ছে। এই কারণ গলার কাঁটা হয়ে উঠা জাহাজ তিনটি নিলামে বিক্রির সিদ্ধান্ত নিয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। এখন জাহাজ তিনটির বর্তমান অবস্থায় মূল্য নির্ধারনে ডিজি (শিপিং) কার্যালয়ের সার্ভেয়ার দিয়ে জাহাজ তিনটি সার্ভে করা হচ্ছে। এরপরই নিলাম প্রক্রিয়া শুরু হবে।

তবে একাধিক বন্দর ব্যবহারকারী শিপিং এক্সপ্রেসকে বলছেন, চট্টগ্রাম-পাঁনগাও নৌপথে বেসরকারী নয়টি কম্পানির জাহাজ পণ্য পরিবহন করছে। নারায়নগঞ্জের আশপাশে একাধিক বেসরকারী টার্মিনাল গড়ে উঠেছে; এখন পণ্য পরিবহনে অনেক বেশি গতি এসেছে। এই সময়ে জাহাজ পরিচালনা করলে ভালোই সুফল পেতাে বন্দরকর্তৃপক্ষ কিন্তু বন্দর এই খাতে একেবারেই অনভিজ্ঞ। অনভিজ্ঞতার কারণে ৫৬ কোটি টাকার এই প্রকল্প পুরোটাই লস হলো!

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here